কক্সবাজারের হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের একটি কম্পিউটার ল্যাবে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করে পাঁচ চীনা ও এক তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের শুক্রবার বিকেলে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনের একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
পুলিশের দাবি, পর্যটকদের জন্য ব্যবহৃত এই রিসোর্টটির আড়ালে একটি কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা হয়েছিল, যেখান থেকে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড বা স্ক্যাম পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে। তবে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন কী কাজে ব্যবহার করা হতো এবং কোন প্ল্যাটফর্মে সেগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জব্দ করা সরঞ্জামগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তবে বাংলাদেশে অবস্থানের উদ্দেশ্য এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে তারা সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি। পুলিশ আরও জানিয়েছে, এই চক্রের সাথে আরও চারজন পলাতক এবং প্রায় ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত জানান, আইফোনসহ জব্দ করা সরঞ্জামগুলো তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি জানান, আইফোনগুলো নির্দিষ্ট কোন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষার পর পরিষ্কার হবে।
পুলিশের তথ্যমতে, পুলিশের সন্দেহ ও সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে গত ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযানের কথা জানতে পেরে অভিযুক্তরা সেখান থেকে পালিয়ে যান। ওই দিনই পুলিশ সেখান থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস এবং ২৪টি কানেকশন বোর্ড জব্দ করে।
এছাড়া ১৫টি নোট খাতা, একটি ডায়েরি, এবং পাঁচটি সিম কার্ড পাওয়া গেছে।
মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, বিদেশিরা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে রিসোর্টটি ভাড়া নিয়েছিলেন। তিনি জানান, ঝান ইউয়ান ফান নামের এক চীনা নাগরিক 'বাবর আলী' নাম ব্যবহার করে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে চারটি স্থাপনা ভাড়া নেন। এই স্থাপনাগুলোর মধ্যে মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট ছাড়াও উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লু রিসোর্ট এবং ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি আবাসিক ভবন ছিল।
পুলিশের দাবি, রিসোর্টগুলো ভাড়া নেওয়ার পর তারা পুরোনো ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজিয়ে নিয়েছিলেন এবং নিরাপত্তাকর্মী ও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাপনা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন।
গত ২৬ আগস্ট ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলটি ওই রিসোর্ট পরিদর্শন করে। পুলিশের দাবি, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মৌখিকভাবে মতামত দিয়েছেন যে, সংশ্লিষ্ট চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা প্রতারণা ও অনলাইনভিত্তিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।\n
২৮ আগস্ট কাউন্টার টেররিজমের অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর পুলিশকে জানান যে, এই ব্যক্তিরা কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন, ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা ও অর্থ আত্মসাতের মতো সংঘবদ্ধ অনলাইন আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এই বিপুল পরিমাণ আইফোন অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্কের অংশ কি না, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কম্পিউটার ল্যাবে কী কাজ চলত এবং এর সাথে আন্তর্জাতিক কোনো অনলাইন প্রতারণা চক্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
এই ঘটনায় রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত মামলার বাদী হয়েছেন।
