শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার উত্তর নাকশী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। চরম দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতাকে জয় করে এই সাফল্য পেলেও তার ভবিষ্যৎ পড়াশোনা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে তার পড়াশোনা যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সে।
ফারজানার বাড়ি শেরপুর সদর উপজেলার পলাশিয়া গ্রামে। তার বাবা মো. মতিন মিয়া বৃদ্ধ বয়সেও রাজধানী ঢাকায় ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং মা ফিরোজা বেগম গৃহিণী। চার সদস্যের এই পরিবারের নিজস্ব কোনো কৃষিজমি নেই। মাত্র পাঁচ শতক বসতভিটার ওপর একটি টিনের ঘরে তারা বসবাস করেন।
বাবার সামান্য আয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় ফারজানার পড়াশোনার খরচ জোগানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষার আগে স্কুলের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে না পারায় ফারজানার স্কুলে যাওয়া একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এগিয়ে আসেন এবং মাত্র ১ হাজার টাকা দিয়ে তাকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোফাজ্জল হোসেন জানান, ফারজানা অত্যন্ত মেধাবী এবং পড়াশোনার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। তার বাবার আয় দিয়ে সংসার চালানোই যেখানে কষ্টকর, সেখানে মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অভাবের তাড়নায় ফারজানা নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় একটি সমিতির মাধ্যমে দরজির কাজ শেখে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়িতে বসে নারীদের পোশাক সেলাই করে সে নিজের ও ছোট বোনের পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা করত। একপর্যায়ে পরিবারের ঋণ পরিশোধের জন্য তার মা ঢাকায় গিয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ শুরু করেন। তখন বাড়িতে দুই বোন একা থাকত এবং নিজেদের রান্নাবান্নাসহ সব কাজ শেষ করে স্কুলে যেত।
পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে ফারজানার মা-বাবা একসময় তাকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে পোশাক কারখানায় কাজ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ফারজানা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে জানায়, অর্থের অভাবে তার মা-বাবার কাছে পড়াশোনার গুরুত্ব কমে গেলেও সে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। জিপিএ-৫ পাওয়ার পর আনন্দের চেয়ে দুশ্চিন্তাই এখন ফারজানার সঙ্গী।
কলেজে ভর্তি, বই-খাতা কেনা এবং যাতায়াতের খরচ কীভাবে জোগাড় হবে, তা নিয়ে সে উদ্বিগ্ন। ফারজানার বাবা মো. মতিন মিয়া জানান, মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য তার নেই। কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে বাধ্য হয়েই হয়তো ফারজানার পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হবে। তবে একজন বাবা হিসেবে তিনি মেয়ের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে তার স্বপ্ন পূরণ করতে চান।
বর্তমানে ফারজানার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে তার উচ্চশিক্ষার পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনো সহায়তা না পাওয়া গেলে এই মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
