চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি প্রক্রিয়া ও ক্লাস শুরু হতে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রায় তিন মাসের সেশনজটে পড়তে যাচ্ছে। সাধারণত প্রতি বছর ১ জুলাই থেকে একাদশ শ্রেণির শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, এবার সব প্রক্রিয়া শেষ করে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা আশঙ্কা করছেন, ক্লাস শুরুর সময় পিছিয়ে যাওয়ায় এবং একই সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার সরকারি পরিকল্পনার ফলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হবে। সাধারণত এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ২৪ মাসের শিক্ষাবর্ষ নির্ধারিত থাকে, যার মধ্যে ২০ মাস ক্লাস এবং বাকি চার মাস নির্বাচনি ও বোর্ড পরীক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকে।
এবার ক্লাস শুরু হতে দেরি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ২০ মাসের পরিবর্তে ১৬ থেকে ১৭ মাস প্রস্তুতির সময় পাবে, যা তাদের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্বের কারণে এবার ভর্তির পুরো প্রক্রিয়াটিই পিছিয়ে গেছে। ২০ জুলাইয়ের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা থাকলেও, রেকর্ড ভেঙে ১০ আগস্ট ফল প্রকাশিত হয়।
এরপর ২ সেপ্টেম্বর থেকে ভর্তির আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হবে এবং পুনর্নিরীক্ষণে ফল পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হবে ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে মনোনীত শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি নিশ্চায়নের সময় দেওয়া হয়েছে।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি কার্যক্রম চলবে এবং ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে পুরোদমে ক্লাস শুরু হবে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই বিলম্ব বেশ স্পষ্ট। করোনা মহামারির আগের বছরগুলোতে সাধারণত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই ক্লাস শুরু হতো। ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ১ জুলাই ক্লাস শুরু হয়েছিল।
করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শিক্ষাপঞ্জি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৩ সালে ৮ অক্টোবর এবং ২০২৪ সালে ১১ আগস্ট ক্লাস শুরু হয়েছিল। ২০২৫ সালেও এসএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় ১৫ সেপ্টেম্বর ক্লাস শুরু হয়। এবার এসএসসি পরীক্ষা কিছুটা এগিয়ে এলেও একাদশের ক্লাস শুরুর সময় সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
শিক্ষাপ্রশাসনের এই অগোছালো শিক্ষাপঞ্জি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক অন্তরা পারভীন বলেন, সরকার পরীক্ষা এগিয়ে আনার কথা বলছে, কিন্তু ক্লাস শুরুর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় থাকছে না। একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন মতিঝিল বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী শাকিব শাহরিয়ার।
তিনি জানান, প্রস্তুতির সময় কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতি নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, শিক্ষাপ্রশাসন পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে যতটা আগ্রহী, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণের বিষয়ে ততটা নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, তড়িঘড়ি করে শিক্ষাবর্ষ শেষ করার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এবং অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
তবে শিক্ষা বোর্ডগুলো এই বিলম্বকে বড় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছে না। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ভর্তি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এবার যারা একাদশে ভর্তি হচ্ছে, তারা ২০২৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে।
তাদের হাতে প্রায় ২০ থেকে ২২ মাস সময় থাকবে, যা পরিকল্পনামাফিক ব্যবহার করলে পাঠ্যসূচি শেষ করা সম্ভব। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, শিক্ষাপঞ্জিতে কিছু পরিবর্তন ও সমন্বয় করা হচ্ছে, যা আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসবে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্যার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় এবং আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন হওয়ায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অস্বস্তি কাটছে না।
