রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিশেষ আলোচনা ও পাঠোন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপ্রাণন প্রকাশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে লেখকের নতুন উপন্যাস ‘নিয়ন্ত্রক’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘শখের বাগানে সাপ’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত লেখক, গবেষক ও সমালোচকরা মঞ্জু সরকারের দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবন ও তার রচনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে অনুপ্রাণন প্রকাশনের সম্পাদক আবু মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে মঞ্জু সরকারের অবদান অপরিসীম। তিনি তরুণ লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে লেখক ও গবেষক মফিদুল হক, শিক্ষাবিদ খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, প্রাবন্ধিক চৌধুরী মুফাদ আহমদ, কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস এবং নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার গিয়াসউদ্দিন সেলিম আলোচনায় অংশ নেন।
কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস বলেন, মঞ্জু সরকার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী, যার লেখায় সমাজের গভীর বিশ্লেষণ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ভণ্ডামির চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি আরও বলেন, মঞ্জু সরকারের লেখা পড়া মানে নিজের সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতাকে নতুন করে পাঠ করা। প্রাবন্ধিক চৌধুরী মুফাদ আহমদ লেখকের রসবোধের প্রশংসা করে বলেন, তার চরিত্রগুলো নিজ নিজ ভাষায় কথা বলে, যা সমাজকে বুঝতে পাঠককে সহায়তা করে।
তবে তিনি উপন্যাসে কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের আধিক্য এবং যৌনতার ব্যবহারে আরও সংযমের পরামর্শ দেন। নাট্যকার গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, মঞ্জু সরকার মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে তার কথাসাহিত্যে তুলে ধরেছেন, তা অনন্য। তিনি লেখকের নিভৃতচারী স্বভাবের কথা উল্লেখ করে তার সাহিত্যিক সামর্থ্যের প্রশংসা করেন। শিক্ষাবিদ খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, মঞ্জু সরকার একজন জাত লেখক, যার রসবোধ এবং মানুষের জটিলতা পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা অসাধারণ।
তিনি মওলানা ভাসানীকে নিয়ে একটি বড় উপন্যাস রচনার জন্য লেখকের প্রতি আহ্বান জানান। মফিদুল হক বলেন, মঞ্জু সরকার প্রান্তিক ও অন্ত্যজ মানুষের জীবন এবং বৃহৎ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি লেখকের গল্প বলার ক্ষমতার প্রশংসা করে বলেন, সামান্য ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষের গভীর জীবনবাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষমতা তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
অনুষ্ঠানের শেষাংশে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে মঞ্জু সরকার বলেন, লেখক হিসেবে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। তিনি বর্তমান বইবাজারের নাজুক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, স্বাধীনতার পর একটি বইয়ের যে পরিমাণ কপি ছাপা হতো, বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে। তিনি নিজের লেখাকে সিসিফাসের পাথর ঠেলে পাহাড়চূড়ায় তোলার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, একটি বই ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে হবে।
এই চেষ্টার মধ্যেই লেখকের আনন্দ ও ভালোবাসা নিহিত। তিনি জানান, সামনে তিনি মওলানা ভাসানীকে নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করছেন। অনুষ্ঠানে মঞ্জু সরকারের সাহিত্যকর্মের ওপর একটি মূল্যায়নধর্মী বই প্রকাশের উদ্যোগের কথাও জানানো হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও আয়োজনের মাধ্যমে লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। লেখক তার জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের জন্য প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বই প্রকাশের পর পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানা একজন লেখকের জন্য কঠিন, কিন্তু এই আয়োজনে বিশিষ্টজনদের আলোচনা তার জন্য একটি বিরল অভিজ্ঞতা। সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
