আজ ৩ সেপ্টেম্বর বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ। তাঁর প্রকৃত নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। ব্যক্তিগত ও চলচ্চিত্র জীবনে তাঁর সঙ্গে সুপ্রিয়া দেবীর সম্পর্কের বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। উত্তম কুমারের বয়স যখন ১৯ বছর, তখন প্রথম সুপ্রিয়া দেবী তাঁকে দেখেছিলেন। সেই সময় উত্তম কুমার পাড়ার পরিচিত মুখ ছিলেন এবং মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন।
তিনি সুপ্রিয়া দেবীর ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন, তবে সেই সময়ে তাঁদের মধ্যে সরাসরি পরিচয় ছিল না। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিয়া দেবীর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। সেই সময়ে সুপ্রিয়া দেবী উত্তম কুমারের অভিনীত চলচ্চিত্রের কথা শুনেছিলেন এবং মাঝেমধ্যে তাঁর সিনেমা দেখতেন। ‘বসু পরিবার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময় তাঁদের মধ্যে প্রথম পরিচয় ঘটে।
উত্তম কুমার পরবর্তীতে গৌরী চট্টোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন এবং সুপ্রিয়া দেবী বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জির সঙ্গে ঘর বাঁধেন। তবে তাঁদের কেউই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে সন্তুষ্ট ছিলেন না। ১৯৫৪ সালে বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জির সঙ্গে সুপ্রিয়া দেবীর বিচ্ছেদ ঘটে। অন্যদিকে, উত্তম কুমারের বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও তিনি তাঁর পারিবারিক জীবনে মানসিকভাবে স্বস্তি পাচ্ছিলেন না।
সুপ্রিয়া চৌধুরী ‘আম্রপালি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে তাঁকে এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচন করেছিলেন। সুপ্রিয়া দেবীর অভিনয়ের খ্যাতি উত্তম কুমারের কাছে পৌঁছালে তাঁরা ‘উত্তর মেঘ’, ‘সোনার হরিণ’ ও ‘শুন বরনারী’র মতো চলচ্চিত্রে জুটি হিসেবে কাজ করেন। উত্তম কুমার তাঁর ‘আমার আমি’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, সুপ্রিয়া দেবীর সেবাযত্নে তিনি ধীরে ধীরে জীবনের সব যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠছিলেন এবং তাঁর আশ্রয়ে শান্তির খোঁজ পেয়েছিলেন।
তবে উত্তম কুমার এ কথাও লিখেছিলেন যে, তিনি সুপ্রিয়া দেবীকে কোনোভাবেই ঠকাতে চাননি। সুপ্রিয়া দেবী তাঁর ‘আমার জীবন আমার উত্তম’ বইয়ে লিখেছেন, ১৯৬২ সালের ২ ডিসেম্বর ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে তাঁরা বিয়ের বাঁধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যদিও গৌরী দেবীর সঙ্গে আইনত বিবাহবিচ্ছেদ না হওয়ায় সেই বিয়ের কোনো আইনি মান্যতা ছিল না।
এই সম্পর্ক নিয়ে সেই সময়ে নানা সমালোচনা হয়েছিল। উত্তমের বন্ধু পরিচালক শ্যামল মিত্র বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তিনি উত্তম কুমারকে ভবানীপুরে তাঁর আগের ঠিকানায় ফিরে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন এবং অন্যথায় শুটিং বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। তখন উত্তম কুমার জানিয়েছিলেন যে, তিনি সুপ্রিয়া দেবীকে ছেড়ে যেতে পারবেন না এবং তাঁর কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।
উত্তম কুমার কখনো গৌরী দেবীকে আইনত বিবাহবিচ্ছেদ দেননি, যার ফলে সুপ্রিয়া দেবীকে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতি নিয়ে তৎকালীন সময়ে বিস্তর সমালোচনা হলেও তাঁরা দুজনই সেসবের তোয়াক্কা করেননি। সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে দীর্ঘ ১৭ বছর সংসার করার পর উত্তম কুমার মৃত্যুবরণ করেন।
উত্তমের মৃত্যুর পর সুপ্রিয়া দেবী তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই বাকি জীবন অতিবাহিত করেন। উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের এই অধ্যায়গুলো আবারও নতুন করে সামনে এসেছে।
