বাংলাদেশে প্রচলিত কোর্ট ম্যারেজ বা আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া বিবাহ ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না, তা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। ইসলামি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। সাধারণত বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ বলতে একজন আইনজীবীর উপস্থিতিতে এফিডেভিট বা হলফনামা সম্পাদন করাকে বোঝায়।
যদি এই প্রক্রিয়ার সময় ইসলামি শরিয়তের নিয়ম মেনে দুইজন মুসলমান সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব ও কবুল অর্থাৎ বিয়ের প্রস্তাব প্রদান ও তা গ্রহণ সম্পন্ন হয়, তবে সেই বিবাহ ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ বলে গণ্য হবে। তবে যদি কেবল আইনি নথিতে স্বাক্ষর করা হয় এবং সেখানে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন না হয়, তবে সেই বিবাহ ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ হবে না।
এমন পরিস্থিতিতে ইসলামি নিয়ম মেনে পুনরায় বিবাহ সম্পন্ন করা আবশ্যক। ইসলামি শরিয়তে বিবাহের জন্য প্রধানত দুটি শর্ত অপরিহার্য। প্রথমত, ইজাব ও কবুল হতে হবে, যেখানে এক পক্ষ বিয়ের প্রস্তাব দেবে এবং অপর পক্ষ তা গ্রহণ করবে। দ্বিতীয়ত, বিবাহের সময় দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতি থাকতে হবে।
এই সাক্ষীদের সামনেই বর ও কনেকে ইজাব ও কবুল করতে হবে এবং সাক্ষীদের তা সরাসরি শ্রবণ করতে হবে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, যদি বিবাহযোগ্য নারী ও পুরুষ, যাদের মধ্যে বিবাহ হারাম নয় এবং নারী যদি অন্য কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না থাকেন, তবে যথাযথ পদ্ধতিতে সাক্ষীদের সামনে ইজাব ও কবুল করলে বিবাহ শুদ্ধ হয়।
তবে অভিভাবকের সম্মতি ও উপস্থিতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও হানাফি মাজহাব অনুযায়ী অভিভাবকের উপস্থিতি ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যায়, তবুও ইসলামে বিবাহকে একটি মহৎ ইবাদত এবং জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই পরিবারের মুরুব্বি ও অভিভাবকদের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে বিবাহ সম্পন্ন করাই সমীচীন।
বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে বাবা, ভাই বা তাদের অবর্তমানে অন্য অভিভাবকের মতামত গ্রহণ করা জরুরি। অনেক আলেমের মতে, অভিভাবকদের মতামত ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন করলে তা শুদ্ধ হয় না। বিবাহের মতো একটি স্পর্শকাতর ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কেবল ক্ষণিকের আবেগের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং পাত্র-পাত্রীর সামাজিক সমতার বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ভুল সিদ্ধান্তের কারণে জীবনের সম্মান ও শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে। তরুণ-তরুণীদের বোঝা প্রয়োজন যে, মা-বাবা বা পরিবারের মুরুব্বিরা সাধারণত সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। তারা বিয়ের স্থায়িত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই অনেক সময় তরুণ বয়সের তাড়াহুড়ো বা পছন্দকে তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নিতে পারেন না। তাই অভিভাবকদের আপত্তির কারণ তাৎক্ষণিকভাবে বোধগম্য না হলেও তাদের অভিজ্ঞতা ও কল্যাণকামিতার ওপর ভরসা রাখা উচিত।
বিয়ের জন্য তাড়াহুড়ো না করে প্রয়োজনে অভিভাবকদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং তাদের সম্মতি ও দোয়া নিয়েই বিবাহ সম্পন্ন করা উত্তম। পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এবং জীবনের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে বিবাহ সম্পন্ন করাই ইসলামি জীবনব্যবস্থায় উৎসাহিত করা হয়েছে।
