ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে শাখা ছাত্রদলের এক নেতা কর্তৃক ছাত্রশিবির নেতাকে থাপ্পড় মারার ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দুপুর পৌনে দুইটার দিকে এই ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় ছাত্রদল ও বহিরাগতরা দেশীয় অস্ত্র হাতে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের এলাকায় অবস্থান নিয়ে মহড়া দেয়।
এই উত্তেজনার মাঝে ছাত্রদল, যুবদল এবং স্থানীয় বিএনপির হামলায় শহীদুল ও বাবুল নামের দুই জামায়াত কর্মী আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হল শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী জুহায়েরের ওপর হামলা হয়। শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলীনুর রহমান তাকে থাপ্পড় মারেন। কাজী জুহায়ের দাওয়াহ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং আলীনুর রহমান আরবি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। জানা যায়, শনিবার দুপুরে জুহায়ের হলের করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আলীনুর হঠাৎ করে এসে তাকে থাপ্পড় মারে।
এই ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশিত হয়েছে। অন্যান্য শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে আলীনুর তাদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করে নিজের কক্ষের ২১৭ নম্বর কক্ষে চলে যান।
এর পরপরই শিবির নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে আলীনূরের রুমের জানালার গ্লাস ভাঙচুর করে। প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা এসে তাদেরকে সরিয়ে নিয়ে উভয়পক্ষের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে হল অফিসে আলোচনায় বসেন। ভুক্তভোগী জুহায়ের সেখানে উপস্থিত হলে প্রক্টরিয়াল বডি আলীনুরকে কক্ষ থেকে আনতে যায়। তবে শিবির কর্মীদের উত্তেজনায় তাকে কক্ষ থেকে বের করতে না পারায় ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ সভা ত্যাগ করেন।
সভা ত্যাগ করে বের হতে গেলে উভয়পক্ষের মধ্যে উচ্চবাচ্য ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরবর্তীতে পুলিশি সহায়তায় আলীনুরকে প্রক্টরিয়াল বডির গাড়িতে নিতে গেলে শিবির কর্মীরা তার ওপর চড়াও হয়ে কিল-ঘুসি মারে এবং গাড়ির কাচ ভেঙে ফেলে।
একপর্যায়ে ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করে। সেখানে রামদাসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র হাতে বহিরাগতদের মহড়া দিতে দেখা যায়। অন্যদিকে, শিবির নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা হাতে জিয়া মোড়ে অবস্থান নেন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ছাত্রদল প্রধান ফটকের তালা খুলে দেয়। এর পরপরই ছাত্রদল-যুবদল ও স্থানীয় বিএনপির হামলায় প্রধান ফটক এলাকায় শহীদুল ও বাবুলের মতো দুই জামায়াত কর্মী আহত হন।
সন্ধ্যার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। তবে তারা পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে বাধা উপেক্ষা করে বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন।
ভুক্তভোগী কাজী জুহায়ের জানান, তার পায়ের লিগামেন্টে সমস্যার কারণে তিনি ক্রাচে ভর করে হাঁটছিলেন। তিনি বলেন, আলীনুর আচমকা এসে তাকে থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। জুহায়েরের দাবি, তার সঙ্গে আলীনুরের কোনো পূর্ব বিরোধ ছিল না। তিনি যখন কারণ জিজ্ঞেস করেন, তখন আলীনুর তাকে 'বেয়াদব' বলে থাপ্পড় মারার কথা জানান।
অভিযুক্ত আলীনুর রহমান বলেন, তিনি তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে বেয়াদব বলেন। এরপর জুহায়ের তাকে গালি দিলে তিনি তাকে থাপ্পড় মারেন। আলীনুরের দাবি, তার সঙ্গে জুহায়েরর কোনো পূর্ব সমস্যা ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমী মিথুন জানান, তারা সমাধানের উদ্দেশ্যে কর্তৃপক্ষকে নিয়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। তবে শিবিরের পক্ষ থেকে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় এবং তাদের সদস্য সচিবকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়। এরপর তারা আলোচনা সভা ত্যাগ করেন। প্রক্টর অফিসে দীর্ঘ সময় আলোচনার পর রাত ৮টায় উভয়পক্ষ সমঝোতায় আসেন।
প্রক্টর অফিসে আলোচনায় তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, তাদের হল সেক্রেটারির ওপর ছাত্রদল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, শান্ত ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করতে ছাত্রদলের বহিরাগতরা দেশীয় অস্ত্র হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসে মহড়া দিচ্ছে। তিনি এই হামলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ জানান, দুই পক্ষের মাঝে একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান জানান, তিনি হল প্রশাসনকে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশাসনও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবে। তদন্তের আলোকে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হলো যেন ক্যাম্পাসে কোনো বহিরাগত প্রবেশ করতে না দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
প্রক্টরিয়াল বডির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঘটনার দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিতকরণের জন্য তিন কার্যদিবসের সময় দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, হলে মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টন এবং ক্যাম্পাসের ছাত্রসংগঠনগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
