পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ.) এবং মিশরের আজিজের স্ত্রী জুলেখার কাহিনি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। এই কাহিনির মূল ভিত্তি হলো ইউসুফ (আ.)-এর চারিত্রিক পবিত্রতা এবং আল্লাহর প্রতি তার অবিচল আস্থা। মিশরের আজিজ ইউসুফ (আ.)-কে দাস হিসেবে কিনে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেছিলেন। ইউসুফ (আ.) যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হন, তখন জুলেখা তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন এবং তাকে অনৈতিক সম্পর্কের দিকে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেন।
পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফের ২২ থেকে ২৪ নম্বর আয়াতে এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জুলেখা ঘরের দরজা বন্ধ করে ইউসুফ (আ.)-কে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইউসুফ (আ.) আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং নিজেকে সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্ত রাখেন।
তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, তার মনিব তাকে সুন্দরভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছেন এবং যারা সীমালঙ্ঘনকারী, তারা কখনো সফল হয় না। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আ.)-কে তার নিদর্শন দেখিয়েছিলেন যাতে তিনি অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারেন। পরবর্তীতে জুলেখার চক্রান্তের কারণে ইউসুফ (আ.)-কে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়।
দীর্ঘ কারাবাসের পর ইউসুফ (আ.) মুক্তি পান এবং তার নির্দোষিতা প্রমাণিত হয়। সুরা ইউসুফের ৫১ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, মিশরের বাদশাহর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে জুলেখা নিজেই স্বীকার করেন যে, ইউসুফ (আ.) নির্দোষ ছিলেন এবং তিনিই তাকে প্ররোচিত করেছিলেন। এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে ইউসুফ (আ.)-এর সততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ.) ও জুলেখার কাহিনি মূলত এখানেই শেষ হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, জুলেখা তওবা করার পর ইউসুফ (আ.)-এর দোয়ায় যৌবন ফিরে পেয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তাদের বিয়ে হয়েছিল। কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে যে, স্বামীর মৃত্যুর পর বার্ধক্যে উপনীত জুলেখা ইউসুফ (আ.)-এর দোয়ায় পুনরায় যৌবন লাভ করেন এবং তাদের সংসারে দুটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
এই ধরনের বর্ণনা তাফসিরে ইবনে আবি হাতেমের মতো গ্রন্থে উল্লেখ থাকলেও, তা কোরআন বা নির্ভরযোগ্য কোনো হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। ইসলামি স্কলারদের মতে, ইসরাইলি বর্ণনা বা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত কাহিনিগুলো ঐতিহাসিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। এসব বর্ণনায় মানুষের তৈরি বহু কাহিনি ও অতিরঞ্জিত বিবরণ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাই কোরআনে বা বিশুদ্ধ হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই এমন কোনো ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে সত্য বলে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের মূল শিক্ষা হলো ধৈর্য, সততা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা। জুলেখার যৌবন ফিরে পাওয়ার বিষয়টি কোনো নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় উৎস থেকে প্রমাণিত না হওয়ায় একে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গণ্য করা যায় না।
কোরআনের বর্ণনায় ইউসুফ (আ.)-এর চারিত্রিক মাহাত্ম্য এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত হিকমত ও জ্ঞানের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কাহিনি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করাই মূল উদ্দেশ্য, কোনো কাল্পনিক বা অস্পষ্ট ঘটনার সত্যতা অনুসন্ধান করা নয়।
