ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি শুরু করছেন আরিফ হোসেন। তিনি ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন বিষয়ে গবেষণার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন।
আরিফ হোসেনের এই যাত্রা সহজ ছিল না। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নদীবেষ্টিত বাঞ্ছারামপুর এলাকায় বেড়ে ওঠেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় খেলাধুলার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি, তবে মাধ্যমিকে ওঠার পর পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ তৈরি হয়। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষক-সংকট থাকায় তিনি নবম ও দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ পাননি এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ বেছে নিতে হয় তাঁকে।
মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। তাঁর মা এবং মামার শিক্ষাজীবনের গল্প তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
আরিফ হোসেনের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফার্গো শহরের সাথে পরিচয় হয় হুমায়ূন আহমেদের ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ বইটির মাধ্যমে। এই বইটিতে লেখক তাঁর ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা এবং নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির জীবন নিয়ে লিখেছেন। আরিফ হোসেন বলেন, তিনি হুমায়ূন আহমেদের বই পড়েই প্রথম ফার্গো এবং নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইউনিভার্সিটির নাম জানতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তবে হঠাৎ গুরুতর পিঠের ব্যথা এবং আর্থ্রাইটিসের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই অসুস্থতা এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি একটানা এক ঘণ্টাও বসে থাকতে পারতেন না। এর ফলে তাঁর বিসিএস এবং উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে যেতে হয় এবং সেখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। n
শিক্ষকতার সাথে যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে তাঁর উচ্চশিক্ষার পুরোনো স্বপ্নটি আবার ফিরে আসে। তিনি ঢাকার একটি কলেজের প্রফেশনাল বিবিএ বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার সাথে সাথে তিনি আইইএলটিএস এবং জিআরই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ভালো ফল করেন।
২০২৩ সালের ফল সেমিস্টারে তিনি নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাগ্রিবিজনেস অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিকস বিভাগে ভর্তি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তিনি পূর্ণ টিউশন মওকুফসহ এই পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট কাউন্সিলের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালে তিনি অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিকসে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
n
মাস্টার্স শেষ করার পর পিএইচডির জন্য তিনি এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। কারণ নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন পিএইচডি প্রোগ্রামটি প্রতি দুই বছর পরপর নতুন শিক্ষার্থী গ্রহণ করে। এই অপেক্ষার সময়টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ শিক্ষার্থী হিসেবে অবস্থানের অনিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে তিনি পরিসংখ্যানের মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হন।
তিনি মনে করেন, পরিসংখ্যানের পড়াশোনা তাঁর গবেষণাজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
২০২৫ সালে তিনি ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন পিএইচডি প্রোগ্রামে আবেদন করেন এবং পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করার প্রস্তাব পান। তাঁর ভর্তি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিবন্ধনের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং এই মাসেই তাঁর পিএইচডির ক্লাস শুরু হচ্ছে।
আরিফ হোসেন বলেন, তিনি এখন পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, অর্থনীতি, ঝুঁকি এবং পরিসংখ্যানের সমন্বয়ে এমন গবেষণা করতে চান যা বাস্তব সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখবে। তিনি গবেষক হওয়ার দীর্ঘ পথের শুরু হিসেবে এই পিএইচডিকে দেখছেন।
