বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দায়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কারারুদ্ধ করা হয়। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষণের সমালোচনা করায় তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। সেই সময়ে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান ঘটেছিল।
নজরুল ইসলাম তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সমগ্র জাতিকে সংগ্রামের পথে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নিজ সাহিত্যের সৃজনে লিখিতভাবে ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরেন। ১৯২০ সালে সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ-এর সম্পাদকীয়তে তিনি ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে খোলাখুলিভাবে কলম ধরেন। তাঁর প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিল রুশ বিপ্লব, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা এবং আধুনিক তুরস্কের উত্থান।
এই ধরনের লেখার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁর পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে এবং গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকার ১২ আশ্বিন সংখ্যায় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামক দীর্ঘ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটি বিপ্লবীদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। ব্রিটিশ সরকারের এদেশীয় রাজকর্মচারীরা কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ করে ভাইসরয় লর্ড রিডিংয়ের কার্যালয়ে পাঠায়।
এর ফলে ব্রিটিশ সরকার নজরুলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার অনুমোদন দেয়। তৎকালীন বাংলা সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ১৫৩ ধারা এবং ভারতীয় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১২৪(ক) ধারার আওতায় কলকাতা চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা দায়ের করে। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর বিকেলে কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় পুলিশ লাইন সড়ক থেকে কাজী নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়।
২৪ নভেম্বর থেকে ১৯২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি বিচারাধীন রাজবন্দি হিসেবে কারাবন্দি ছিলেন। ১৮ জানুয়ারি তাঁকে কলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তর করা হয়। ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল কারা কর্তৃপক্ষ নজরুলকে বহরমপুর জেলে পাঠানোর কথা বলে হুগলি জেলে স্থানান্তর করে। এই স্থানান্তরের সময় তাঁকে সাধারণ কয়েদির ইউনিফর্ম ও খাটো কুর্তা পরানো হয়, যা একজন রাজবন্দির মর্যাদার পরিপন্থী ছিল।
হুগলি জেলে তাঁকে সাধারণ কয়েদির খাবার ও পোশাক দেওয়া হয় এবং লোহার থালায় খাবার পরিবেশন করা হয়। জেল সুপার থার্সটনের অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে নজরুল ইসলাম আমরণ অনশন শুরু করেন। তাঁর এই অনশনের খবরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নলিনীকান্ত সরকার, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিচলিত হয়ে পড়েন।
১৯২৩ সালের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টেলিগ্রামের মাধ্যমে নজরুলকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান। তিনি লেখেন, অনশন বন্ধ করো, আমাদের সাহিত্যে তোমাকে দরকার। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বসন্ত নাটকটি নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন। কারাবন্দি অবস্থায় নজরুল ইসলাম তাঁর জেলজীবনের স্মৃতি নিয়ে ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন।
সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, জেলখানায় রাজবন্দি হিসেবে তাঁর মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং তাঁকে দাগি অপরাধীর মতো ডাণ্ডাবেড়ি ও নির্জন সেলে রাখা হয়েছিল। তিনি আরও লেখেন যে, সাহিত্যিকদের একাংশ তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিল, যা তাঁকে পুলিশের জুলুমের চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছিল। নজরুল ইসলামের এই অনশন ও কারাবরণ তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল।
ব্রিটিশ শাসকরা তাঁকে দমনের জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালালেও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
