আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম ও হত্যার অভিযোগে সাক্ষ্য দিয়েছেন আব্বাস মল্লিক নামের এক ট্রলার মাঝি। বুধবার এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে তিনি তার জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক দাবি করেন, ২০১০ সালে র্যাবের অভিযানের সময় ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা বন্দিদের নৌকায় করে গভীর নদীতে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো।
তিনি অভিযোগ করেন, এসব হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান সরাসরি অংশ নিতেন। আব্বাস মল্লিক বর্ণনা করেন যে, বন্দিদের নৌকায় তোলার পর তাদের গভীর নদীতে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে পৌঁছানোর পর বন্দিদের নৌকার দুই পাশে বসিয়ে র্যাব সদস্যরা চেপে ধরতেন। এরপর জিয়াউল আহসান নিজে ওই বন্দিদের মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন।
গুলিতে নিহত হওয়ার পর মৃতদেহের গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। সাক্ষী আরও দাবি করেন, বন্দিদের পেট কেটে দেওয়া এবং মাথায় গুলি করার কারণে নাড়িভুঁড়ি ও মস্তিষ্ক বেরিয়ে আসতো এবং শরীর থেকে প্রচুর রক্ত পড়তো। এ কারণে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর বোট ধোয়ার প্রয়োজন হতো।
বোট ধুয়ে তারা চর দুয়ানীর বরফ মিলে ফিরে আসতেন। আব্বাস মল্লিকের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের পর মেজর সাব্বির নামের আরেক কর্মকর্তা মাঝিদের জিয়াউল আহসানের কাছে ডেকে পাঠাতেন। জিয়াউল আহসান তখন মাঝিদের খামে করে কখনো দুই হাজার, আবার কখনো পাঁচ হাজার টাকা দিতেন। আব্বাস মল্লিক জানান, তার বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চর দুয়ানী গ্রামে।
তিনি জানান, ২০১০ সালে র্যাব সদস্যরা চর দুয়ানী ও কাঠালতলী এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। র্যাব সদস্যরা বোট মালিকদের ডেকে অভিযানের জন্য ট্রলার বা বোট দিতে বলতেন। তিনি দাবি করেন, যেদিন র্যাব সদস্যরা এলাকায় আসতেন, সেদিন বিকেলে সাদা পোশাকে দুজন র্যাব সদস্য এসে দোকান মালিকদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ ও বাতি নিভিয়ে রাখতে নির্দেশ দিতেন।
রাত ১১টা বা ১২টার দিকে চার-পাঁচটি মাইক্রোবাস এসে বরফ মিলের সামনে থামত এবং সেখান থেকে হাত ও চোখ বাঁধা বন্দিদের নৌকায় তোলা হতো। এসব বন্দিকে ঢাকা থেকে আনা হতো। বন্দিদের সঙ্গে সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা নেওয়া হতো স্থানীয় রিয়াজের দোকান থেকে। এরপর মাঝিদের নৌকা চালিয়ে বলেশ্বর নদীর গভীর পানিতে যেতে বলা হতো।
আব্বাস মল্লিক তার ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন। তিনি জানান, তার ভাই আলকাছ র্যাবের সঙ্গে নৌযান চালানোর কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে র্যাবের পরিচয়ে ফোন পাওয়ার পর আলকাছ বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। আব্বাস দাবি করেন, র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে তার ছোট ভাই বাজারে আলোচনা করতেন, যার কারণে র্যাব তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
আলকাছ নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র্যাব অফিসে গিয়েও তার কোনো সন্ধান পাননি। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি শেষে জিয়াউল আহসানের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান সাক্ষী আব্বাস মল্লিককে জেরা করেন। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও তাসমিরুল ইসলাম।
এই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
