স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলমের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পদায়নের আদেশ বাতিল করেছে। নানা অনিয়ম, বিতর্ক এবং জুলাই অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ ওঠার পর মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গত ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে তার এই পদায়ন আদেশ বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
এর আগে গত ৩০ জুলাই তাকে রহস্যজনকভাবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক পদে পদায়ন করা হয়েছিল। ডা. মোরশেদ আলমের এই পদায়ন ঘিরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক অসন্তোষ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। গত ২২ জুলাই তাকে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছিল।
তবে সেই আদেশ জারির মাত্র আট দিনের মাথায় তাকে পুনরায় ঢাকায় পদায়ন করা হয়, যা চিকিৎসক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ডা. মোরশেদ আলম বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে যে, সেই সময়ে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
এছাড়া ভিন্নমতের চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরবর্তীতে একটি বিশেষ মহলের সহযোগিতায় তিনি পুনরায় হাসপাতালে ফিরে আসেন এবং পদায়ন পান বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে তার পুনরায় যোগদানের খবর ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের দাবি তোলা বিভিন্ন পক্ষ তার এই পদায়নের তীব্র বিরোধিতা করে। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার বিতর্কিত পদায়ন বাতিল করায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা প্রদান করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো রোধ করতে মন্ত্রণালয়কে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ডা. মোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে যথাযথ তদন্তের দাবিও জোরালো হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই পদায়ন বাতিলের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্কিত নিয়োগ এড়াতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্টরা।
ডা. মোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সাধারণ চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই তার পদায়ন বাতিলের দাবি উঠেছিল। মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত সেই দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে তার পদায়ন বাতিল করেছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে স্বাস্থ্য খাতে চলমান অস্থিরতা কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদায়ন ঠেকাতে মন্ত্রণালয়কে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি। ডা. মোরশেদ আলমের এই ঘটনাটি স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়ে মন্ত্রণালয় কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
