বন্যা ও স্রোতের কারণে প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সড়ক, বাঁধ এবং নদীর তীর রক্ষায় প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কংক্রিট, পাথর বা জিও ব্যাগের মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে ‘বিন্না ঘাস’ ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। মাটির গভীরে শক্ত শিকড় ছড়িয়ে মাটি আঁকড়ে ধরে রাখার ক্ষমতার কারণে এই ঘাসকে ভাঙন রোধে কার্যকর মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ১৭ আগস্ট সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সড়ক ও বাঁধের ভাঙন রোধে বিন্না ঘাস ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহ-উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বিন্না ঘাস ব্যবহারের একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন।
সভায় সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে এই ঘাসের ব্যবহার পর্যালোচনার জন্য অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে একটি কারিগরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনকে এই বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিন্না ঘাস বা ভেটিভার গ্রাস মাটির নিচে শক্ত ও গভীর শিকড় তৈরি করে, যা মাটির কণাকে প্রাকৃতিক জালের মতো আটকে রাখে।
বুয়েটের গবেষণায় দেখা গেছে, শিকড়যুক্ত মাটির সহনশীলতা শিকড়বিহীন মাটির তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি এবং এটি শিকড়বিহীন মাটির তুলনায় ৫১৫ শতাংশ বেশি বিকৃতি সহ্য করতে পারে। এই ঘাসের ঘন গোছা মাটির ওপর উদ্ভিদপ্রাচীর তৈরি করে পানির প্রবাহ ধীর করে দেয়, যা মাটির ক্ষয় ও ভূমিধস কমাতে সহায়তা করে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন স্থানে এই ঘাস রোপণ করেছে। সওজের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাত বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভারী বর্ষণ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বিন্না ঘাস রোপণ করা সড়কের ঢালের মাটি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এলজিইডি ২০২১-২২ অর্থবছরে সারা দেশে ১৭১ কিলোমিটার সড়কে এই ঘাস রোপণ করেছিল।
এছাড়া কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাড়ে ৩০০ মিটার এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বিন্না ঘাস লাগানো হয়, যা বর্তমানে ৩ ফুট উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং প্রাকৃতিকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পেও বিন্না ঘাস রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ১৬ আগস্ট পানি ভবনে আয়োজিত এক সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি নদীভাঙন ও ভূমির অবক্ষয় রোধে বিন্না ঘাসকে একটি সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি নদীর তীর, বাঁধের ঢাল, হাওরাঞ্চল এবং ক্ষয়প্রবণ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে এই ঘাস রোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম জানান, দেশে বাঁধ ও সড়ক রক্ষায় হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা বিন্না ঘাসের ব্যবহারের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এই ঘাসের ব্যাপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালেহ আহম্মদ খান জানান, বিন্না ঘাস দেশীয় প্রজাতির হলেও এটি আগ্রাসী স্বভাবের হতে পারে।
এর গভীর ও ঘন শিকড় মাটির পুষ্টি ও আর্দ্রতা দ্রুত শোষণ করে, যার ফলে আশপাশের অন্যান্য দেশীয় উদ্ভিদ পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে। তাই সব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে সরকার এই ঘাসকে কংক্রিট বা জিও ব্যাগের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখছে না, বরং মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া, চীন, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামসহ বিশ্বের শতাধিক দেশে ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ ও ঢাল স্থিতিশীল রাখতে বিন্না ঘাস সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও উপকূলীয় বাঁধ, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি ঢালে এর ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। সরকারের লক্ষ্য হলো অবকাঠামো নেটওয়ার্কের ক্ষয়প্রবণ অংশগুলোতে এই প্রাকৃতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
