পরিবারের দৈনন্দিন কাজের বাইরেও মাথার ভেতর সারাক্ষণ চলতে থাকা অসংখ্য ছোট ছোট পরিকল্পনা ও চিন্তার বোঝা নারীদের চরম ক্লান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার বা কাপড় ধোয়ার মতো দৃশ্যমান কাজের বাইরেও সন্তানের স্কুলের সময়সূচি, চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা তৈরি এবং পরিবারের সদস্যদের সময়সূচি মনে রাখার মতো অদৃশ্য দায়িত্বগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরাই পালন করেন।
এই মানসিক চাপের কারণে অনেক নারী দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদে ভুগছেন। যুক্তরাষ্ট্রের তিন হাজার অভিভাবকের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহস্থালি কাজের মধ্যে যেসব কাজে মানসিক পরিশ্রম বেশি প্রয়োজন, তার ৭১ শতাংশই মায়েরা সামলান। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিয়া রুপানার বলেন, এই মানসিক বোঝার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি অদৃশ্য, দীর্ঘস্থায়ী এবং এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
কর্মক্ষেত্রে মানুষ কাজের চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পেলেও সংসারের এই অদৃশ্য বোঝা নারীদের সারাক্ষণ বহন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মায়েরা পরিবারের 'ডিফল্ট অভিভাবক' হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সন্তানের স্কুল সংক্রান্ত সব যোগাযোগ, জন্মদিনের আয়োজন বা শিক্ষা সফরের মতো বিষয়গুলো মায়ের ফোনে আসে। অনেক বাবা এসব কাজকে ছোটখাটো মনে করলেও, এর পেছনে থাকা পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মানসিক শক্তিকে গুরুত্ব দেন না।
লন্ডনের দুই সন্তানের বাবা স্যাম বেরি জানান, শুরুতে তিনিও বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, সন্তানের ডায়াপার পরিবর্তন বা খাওয়ানোর মতো কাজগুলো করলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু পরে তিনি উপলব্ধি করেন যে, কাজের পরিকল্পনা করা এবং কী করতে হবে তা আগে থেকে ভেবে রাখাটাও দায়িত্বের অংশ।
ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী নাতাশা ওয়ালেস বলেন, অনেক নারী তার কাছে এসে এমন চাপের কথা বলেন যার পেছনে একটি বড় কারণ নয়, বরং শত শত ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্লান্তি থাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ ঘুমের সমস্যা, বিরক্তি এবং কর্মক্ষেত্রে মনোযোগের অভাব তৈরি করে। অভিভাবকত্ব বিশেষজ্ঞ আনিতা ক্লিয়ারের মতে, এই মানসিক ক্লান্তির প্রভাব শুধু ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা কর্মক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষকে কর্মদগ্ধতার দিকে ঠেলে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষের আয় বাড়লে সংসারের শারীরিক ও মানসিক শ্রমে তাদের অংশগ্রহণ কমে যায়। অন্যদিকে নারীর আয় বাড়লেও তাদের মানসিক দায়িত্বের পরিমাণ একই থাকে। এই বৈষম্য দূর করতে বিশেষজ্ঞরা দায়িত্বের মালিকানা পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন। কেবল কাজটি করে দেওয়া নয়, বরং কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
বাবা ও মানসিক বোঝা নিয়ে কাজ করা কোচ জ্যাক ওয়াটসন বলেন, সঙ্গীকে বারবার জিজ্ঞেস না করে নিজের দায়িত্বে কাজের পুরো বিভাগ বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। যেমন, সন্তানের স্কুলের প্রশাসনিক সব দায়িত্ব বাবা নিতে পারেন এবং খাবারের বিষয়টি মা সামলাতে পারেন। এভাবে দায়িত্ব ভাগ করলে বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন থাকে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংসারের এই অদৃশ্য চাপ কমাতে সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা, যৌথ ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা এবং সবকিছু নিখুঁতভাবে করার চাপ কমানো জরুরি। সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রথম ধাপ হলো কাজের তালিকা ভাগ করা নয়, বরং কে কতটা ভাবছে এবং পরিকল্পনা করছে—সেটি স্বীকার করা। একটি পরিবার কেবল হাতে করা কাজ দিয়ে চলে না, বরং শত শত চিন্তার ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে, যা অনেক সময় নারীরা নীরবে নিজের মাথায় বয়ে বেড়ান।
এই অদৃশ্য কাজের স্বীকৃতিই হতে পারে সমতা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ।
