সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের পেনশন ও ভাতার বকেয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সিসিডিএফ কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্সের (সিজিডিএফ) অধীন চিফ কন্ট্রোলার অব ডিফেন্স ফাইন্যান্স (পেনশন অ্যান্ড ফান্ড) বা সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান এবং ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার ইশরাত জাহানকে ২ সেপ্টেম্বর বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই জালিয়াতির জন্য সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার ইউজার আইডির মাধ্যমে ২৬ জন পেনশনভোগীর নামে ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল তৈরি করে মোট ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে।
ত umaনত তদন্তে জানা গেছে, জালিয়াতি চক্রটি অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। এরপর তাঁদের ব্যাংক হিসাবে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হতো এবং বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। কিছু ক্ষেত্রে পেনশন আটকে যাওয়ার ভয় দেখানো হতো অথবা ভুল তথ্যের মাধ্যমে তাঁদের রাজি করানো হতো।
নথিতে দেখা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের মাসিক পেনশন সাধারণত ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে থাকে। তবে জালিয়াতি চক্রটি প্রতি মাসে তাঁদের হিসাবে একাধিকবার অর্থ পাঠাত। লেনদেনের সীমা দুই লাখ টাকা হওয়ায়, প্রতিবার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ টাকা করে পাঠানো হতো।
তদন্তে আরও জানা গেছে, আক্তার হোসেন নামের এক অবসরপ্রাপ্ত সদস্যের হিসাবে এক বছরের বেশি সময়ে প্রায় ৭২ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য জি এম সাজ্জাদ হোসেনের হিসাবে ৩২টি লেনদেনে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা এবং মো. হারুন অর রশিদ মৃধার হিসাবে ২২টি লেনদেনে প্রায় ৪৪ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া মো. শাহিনুর ইসলাম, মো. শাহার আলী, আমজাদ হোসেন এবং খন্দকার আবুল হোসাইনের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে আরও বড় অংকের অর্থ সরানো হয়েছে।
সরানো অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য আদনান এন্টারপ্রাইজ, তামান্না এন্টারপ্রাইজ এবং আদর্শ স্টেশনারি নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে। পেনশনভোগীরা কমিশন রেখে বাকি টাকা এই হিসাবগুলোতে জমা দিতেন।
সরকারি কোষাগারে অর্থ ফেরত এসেছে বলে দেখানোর জন্য ভুয়া ট্রেজারি চালান ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শাহিনুর ইসলামের নামে ১৬ লাখ টাকার একটি চালানের বিপরীতে প্রকৃত জমা ছিল মাত্র ৮ হাজার ৫০ টাকা। একইভাবে জি এম সাজ্জাদ হোসেনের এবং আক্তার হোসেনের নামে জমা দেখানো অর্থের বিপরীতে অত্যন্ত সামান্য অংকের টাকার ভুয়া চালান ব্যবহার করা হয়েছে।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জালিয়াতির কথা জানার পর তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জালিয়াতিটি অনেক আগে থেকে চলে আসছে। কিছু সূত্রের দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের আমল থেকে তদন্ত করা হলে আরও বড় অংকের অর্থ আত্মসাতের তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে বর্তমানে গঠিত তদন্ত কমিটি কেবল গত দুই অর্থবছরের লেনদেন যাচাই করছে।
