চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২ হাজার ১৪৩টি এবং প্রতিদিন গড়ে ৭০টি শিশু নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি বা জিডি থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ২০ থেকে ২১ মিনিটে একজন শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
নিখোঁজ হওয়া এই শিশুদের মধ্যে কতজন উদ্ধার হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ রয়েছে, তার কোনো সমন্বিত জাতীয় হিসাব নেই। অনেক ক্ষেত্রে শিশু ফিরে আসার পর পরিবারগুলো পুলিশকে অবহিত করে না, ফলে সরকারি ডেটাবেসে নিখোঁজের তথ্যগুলো থেকে যায়। পুলিশ সদর দপ্তর এবং শিশু সুরক্ষায় নিয়োজিত বিশেষ অ্যালার্ট সিস্টেম ‘মুন অ্যালার্ট’-এর তথ্যমতে, শিশু নিখোঁজের পর প্রথম তিন ঘণ্টা উদ্ধারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে অনেক পরিবার শুরুতেই পুলিশকে না জানিয়ে নিজেরা খোঁজাখুঁজি করে সময় নষ্ট করে, যা অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে কিশোরী নিখোঁজের ক্ষেত্রে সামাজিক লোকলজ্জা ও প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি গোপন রাখার প্রবণতা থাকায় পুলিশকে জানাতে দেরি করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিখোঁজ ও পাচারের শিকার শিশুদের একটি বড় অংশই কিশোরী বা তরুণী।
বিভিন্ন এলাকায় কিশোরীদের ঘর ছাড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জের একটি উপজেলায় গত তিন মাসে অন্তত ৪০ জন কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই মুঠোফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে অপরিচিত বা পরিচিত তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পর বাড়ি ছেড়েছে। শিশু মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিশোরীদের বিপথগামী হওয়ার অন্যতম কারণ।
টিকটক ও লাইকি’র মতো অ্যাপগুলো ব্যবহার করে একটি চক্র কিশোরী ও তরুণীদের ফাঁদে ফেলছে। এসব অ্যাপে কমবয়সী মেয়েদের ‘স্টার’ বানিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। বিভিন্ন রিসোর্টে ‘টিকটক মিট-আপ’ বা ‘পুল পার্টি’র নামে কিশোরীদের ডেকে নিয়ে তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা, যৌন ব্যবসায় বাধ্য করা কিংবা বিদেশে পাচার করার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হয়।
সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের ধরনে পরিবর্তন এসেছে এবং নারী, কিশোরী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে কিশোরীদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনাও ঘটছে। ইউনিসেফের ২০১৯ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা ও ভয়ভীতির শিকার হয়েছে।
এর মধ্যে ১৯ শতাংশ শিশু অনলাইনে যৌনতাবিষয়ক বার্তা এবং ১২ শতাংশ যৌনতাবিষয়ক ছবি বা ভিডিও পেয়েছে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, চাইলেই কোনো নির্দিষ্ট অ্যাপ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই এই সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি বন্ধ করার চেয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিভাবক ও শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব রয়েছে।
অভিভাবকরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না তাদের সন্তান অনলাইনে কী করছে বা কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তির বাইরে রাখা সম্ভব নয়, তাই ইন্টারনেটের বিপদ, অনলাইন প্রাইভেসি এবং অনলাইন বন্ধুত্বের ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সচেতন করা প্রয়োজন। নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে এবং এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
