রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত শহীদ জিয়া শিশুপার্কটি দীর্ঘ সাত বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। আধুনিকায়নের নামে এই পার্কটি বন্ধ করে রাখায় শহরের একটি বড় অংশের শিশু-কিশোররা তাদের শৈশবের অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্র থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পার্কটি কবে নাগাদ পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
দীর্ঘ সময় ধরে পার্কটি বন্ধ থাকায় এর আগের রাইডগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে কোনো বিনোদনের সুযোগ অবশিষ্ট নেই। সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কের বিশাল একটি অংশে বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণ করা হয়েছে, যার ছাদ মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু। আগে যেখানে শিশুদের কোলাহল থাকত, সেখানে এখন রাইডের কোনো অস্তিত্ব নেই।
পার্কের প্রবেশপথের সামনে বর্তমানে ছোট ছোট দোকান বসেছে। ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় পার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ পার্কিং তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানোর কারণ দেখিয়ে পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ডিএসসিসি নিজস্ব উদ্যোগে পার্কটি আধুনিকায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, পার্কটি আধুনিকায়নের জন্য ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যা ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। এই প্রকল্পের আওতায় সরকারের ৪৮৩ কোটি টাকা এবং ডিএসসিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ১২০ কোটি টাকা ব্যয় করার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের বড় একটি অংশ অর্থাৎ ৪৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে ইউরোপ থেকে ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপনের জন্য। তবে রাইড কেনার প্রক্রিয়া এবং দরপত্র নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা দেখা দেয়। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ডিএসসিসি পার্কের রাইড কেনাসহ সার্বিক প্রকল্পের কাজ পুনরায় মূল্যায়ন করছে।
ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর পার্কের সংস্কার কাজের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের আশা, সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে পার্কটি শিশুদের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘ এই কালক্ষেপণ নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের নামে দীর্ঘদিন পার্কটি বন্ধ রাখা সরকারের সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি মনে করেন, এর ফলে একটি প্রজন্মের শিশুরা তাদের স্বাভাবিক শৈশবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সাধারণ অভিভাবকরাও পার্কটি দ্রুত খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, নগরে এমনিতেই খেলার মাঠ ও পার্কের সংকট রয়েছে, তার ওপর একটি জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র সাত বছর ধরে বন্ধ থাকা অগ্রহণযোগ্য। পার্কের সামনে আসা অনেক অভিভাবকই সংস্কার কাজের ধীরগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প শেষ হওয়ার পর পার্কের জায়গাটি সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বর্তমানে রাইড স্থাপনের প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলো এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
