১৯৭১ সালের মার্চ মাস বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই মাসের ঘটনাবলি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ১ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ২ মার্চ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন, যার ফলে সরকারি প্রশাসন কার্যত আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এক ঐতিহাসিক জনসভায় ভাষণ দেন।
তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে তিক্ততা না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বাঙালিদের শেখ মুজিবের ওপর বিশ্বাসের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। ১৫ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলি ভুট্টোর আলোচনা চলে। এই আলোচনার আড়ালে পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করতে থাকে।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হয়। ২৬ মার্চ গ্রেপ্তারের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
এই উত্তাল সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলের মতো স্থানগুলো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। ২৪ মার্চ নাখালপাড়ায় অবস্থানরত এক সামরিক কর্মকর্তা পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ইয়াহিয়া-মুজিব সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে এবং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে যাচ্ছে।
২৫ মার্চ সকালে সুগন্ধি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর রেডিওতে ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শোনা যায়, যেখানে সমস্ত দোষ আওয়ামী লীগের ওপর চাপিয়ে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় নয় মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই সময়ে অনেক তরুণ সমাজতন্ত্রের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেয়।
অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের খবরাখবর সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং গ্রেনেড ব্যবহারের কৌশল শেখার মতো কাজে যুক্ত হন। যুদ্ধের সময় গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা কাজ করছিল। অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, আবার অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটেছেন। যুদ্ধের সময়কার এই দিনলিপি কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতির আধার নয়, বরং এটি একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের দলিল।
যুদ্ধের নয় মাস শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। এই বিজয় অর্জনের পেছনে ছিল অগণিত মানুষের ত্যাগ ও সাহসিকতা। যুদ্ধের পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কোনো সুবিধা বা সনদ গ্রহণ করেননি। তারা নীরবে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তাদের এই আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
যুদ্ধের সময়কার সেই দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের মনে যে বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন ছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। মা ও সন্তানের সম্পর্কের গভীরতা এবং যুদ্ধের সময়কার সেই কঠিন বাস্তবতার স্মৃতি আজও অনেকের হৃদয়ে অমলিন। যুদ্ধের সময় প্রাপ্ত গ্রেনেড বা অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার এবং সেই সময়ের ভয়াবহতা আজও ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে।
এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা অর্জনের পথ সহজ ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অসীম সাহসের গল্প। আজকের বাংলাদেশ সেই সংগ্রামেরই ফসল।
