শরৎ ঋতুতে প্রকৃতিতে নানা ধরনের দেশি ফলের সমাহার দেখা যায় যা গ্রামীণ জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে গ্রামবাংলার হাট-বাজারে বিভিন্ন ধরনের মৌসুমী ফল পাওয়া যায়। এই ফলগুলো কেবল স্বাদে অনন্য নয় বরং বাংলার কৃষি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। শরতের ফলের তালিকায় তাল অন্যতম।
পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ এই ঋতুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাল থেকে তালের বড়া, পিঠা ও পায়েসের মতো বিভিন্ন মুখরোচক খাবার তৈরি করা হয়। তালগাছ গ্রামীণ প্রকৃতির একটি পরিচিত দৃশ্য এবং অনেক পরিবারে তাল সংগ্রহ ও তা দিয়ে খাবার তৈরি করা একটি ঐতিহ্যবাহী চর্চা। শরতের আরেকটি জনপ্রিয় ফল হলো পেয়ারা।
বর্ষার শেষ থেকে শরৎকাল পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর পেয়ারা পাওয়া যায়। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও আঁশ থাকে। গ্রামবাংলার বাজারে ঝুড়িভর্তি পেয়ারা এবং বাড়ির আঙিনায় পেয়ারা গাছ শরতের সাধারণ চিত্র। আমড়া এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল। টক-মিষ্টি স্বাদের আমড়া কাঁচা অবস্থায় লবণ ও মরিচ দিয়ে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
এছাড়া আমড়ার ভর্তা, আচার ও চাটনি অনেকের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। স্কুলফেরত শিশুদের হাতে কিংবা গ্রামের ছোট দোকানে আমড়ার উপস্থিতি শরতের দিনগুলোকে প্রাণবন্ত করে তোলে। কামরাঙা শরতের অন্যতম আকর্ষণীয় ফল। পাঁচ কোণা আকৃতির এই ফলটি দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমন বৈচিত্র্যময়। কাঁচা কামরাঙার টক স্বাদ অনেকের কাছে প্রিয় এবং লবণ-মরিচ দিয়ে এটি খাওয়ার আনন্দ শরতের বিকেলকে উপভোগ্য করে তোলে।
ডেউয়া শরতের আরেকটি পরিচিত দেশি ফল যা বাংলার মাটির স্বাদের সঙ্গে মিশে আছে। পাকা ডেউয়া সাধারণত হলুদাভ রঙের হয় এবং এর ভেতরের নরম অংশ বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু। একসময় গ্রামবাংলার বাড়ির আঙিনা ও বাগানে প্রচুর ডেউয়া গাছ দেখা যেত। এই ফলের সঙ্গে অনেক মানুষের শৈশবের স্মৃতি ও দেশি ফলের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দেশি ফলের গাছ কমে যাচ্ছে। বসতভিটা ও কৃষিজমির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে পুরোনো ফলদ গাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক দেশি ফলের স্বাদ ও গন্ধ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই দেশি ফলের গাছ লাগানো, পুরোনো গাছ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় ফলের চাষ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
দেশি ফলের এই বৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে বাংলার কৃষি ও প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ ধরে রাখতে পারবে। শরতের এই ফলগুলো কেবল রসনা তৃপ্ত করে না বরং গ্রামীণ অর্থনীতির ছোট ছোট বাজারেও গতি সঞ্চার করে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই ফলগুলোর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে পারলে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশি ফলের ঐতিহ্যকেও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
কৃষি ও প্রকৃতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশি ফলের গাছ সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এই ফলের গুরুত্ব তুলে ধরা জরুরি। শরতের এই ফলগুলো আমাদের কৃষি সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ যা যথাযথ পরিচর্যার দাবি রাখে।
