জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে গুম ও ভীতির এক ভয়াবহ সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি উপস্থিত ছিলেন।
স্পিকার তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন, টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের নিপীড়ন, নির্যাতন এবং গুমের মাধ্যমে জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলাদেশের মানুষ আর কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। স্পিকারের মতে, তৎকালীন সরকার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালা তৈরি করেছিল এবং ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিপীড়নের আবহ সৃষ্টি করেছিল।
অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তার ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনের দীর্ঘ গুমের মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলে ধরেন। এছাড়া ‘নিপীড়ন থেকে বিপ্লব: রাষ্ট্রের পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন উন্মোচন’ শীর্ষক ডকুমেন্টশনের মাধ্যমে বিগত শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর চালানো প্রাতিষ্ঠানিক দমন-পীড়নের চিত্র উপস্থাপন করা হয়। সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান অনুষ্ঠানে তার ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দেন এবং আয়নাঘরে বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীও তাকে সাত মাস গুম করে রাখার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা তার স্বামী ইলিয়াস আলীকে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গুম করার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, তৎকালীন সরকার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যেই ইলিয়াস আলীকে গুম করেছিল।
তিনি এসব বিচারবহির্ভূত গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও তৎকালীন মাফিয়া সরকারের আমলে তাদের ওপর চালানো রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব মিজ অ্যান্ডা ফিলিপ উপস্থিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এসব হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিরোধী মতাদর্শের অনুসারীদের ওপর নিপীড়নকে অমানবিক ও জঘন্য বলে অভিহিত করেন।
তিনি জানান, তার এই সফর শেষে আইপিইউ গভর্নিং বডিতে বাংলাদেশে সংঘটিত স্বৈরাচারী শাসনামলের গুম, হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রদান করবেন। বিগত সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করতে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের যে অপব্যবহার করা হয়েছিল, তা এই আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মানবাধিকার লঙ্ঘন দেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিচারবহির্ভূত এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
