দেশের কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত করতে পারবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেন। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর গচিহাটা কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া নির্দেশের বিরুদ্ধে গভর্নিং বডির করা একটি রিট আবেদন খারিজ করে আদালত এই আদেশ দেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গচিহাটা কলেজের গভর্নিং বডির এক সভায় সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে এই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির কাছে পাঠানো হয়।
বোর্ডের ওই কমিটি ২০ এপ্রিলের সভায় গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তটি নামঞ্জুর করে এবং শিক্ষক আবুল মনসুরকে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ প্রদান করে। বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি আখতারুজ্জামান হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছিলেন। দীর্ঘ শুনানির পর আদালত রিটটি খারিজ করে দেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বেসরকারি কলেজের গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত করার ক্ষমতা রাখে না। তারা কেবল বরখাস্তের প্রস্তাব দিতে পারে। চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত কার্যকর করার আগে শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির মাধ্যমে যথাযথ অনুমোদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। স্বীকৃত বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে অনুসরণ করা আইনত আবশ্যক।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, তদন্ত কমিটি গঠন করার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। গভর্নিং বডির সভায় আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের মাধ্যমেই কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করা সম্ভব। টেলিফোনে বা মৌখিক নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। গভর্নিং বডির সভাপতি বা অন্য কোনো ব্যক্তির মৌখিক নির্দেশ কখনোই আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের বিকল্প হতে পারে না।
রায়ে আদালত গচিহাটা কলেজের গভর্নিং বডির বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির সিদ্ধান্তকে যথাযথ ও আইনসম্মত বলে ঘোষণা করেছেন। তবে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন শিক্ষক আবুল মনসুর অবসরের বয়সে উপনীত হওয়ায় তাকে আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলে আদালত উল্লেখ করেছেন।
আদালত রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, অবসরের বয়সে পৌঁছানোর তারিখ পর্যন্ত ওই শিক্ষক তার বকেয়া বেতন, চাকরিসংক্রান্ত যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই বকেয়া পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতা রোধে একটি আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী হলো।
শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করা যে আইনত অকার্যকর, তা এই রায়ের মাধ্যমে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রায়ের কপি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
