রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা জানান। ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ)।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা দিয়ে আসছে। তবে বর্তমানে ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মতো অপরাধ বাড়ছে। এসব কর্মকাণ্ড কেবল ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ক্যাম্প-সংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও পরিবেশকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্যাম্পের চারপাশে সীমান্ত বেড়া বা ফেন্সিং নির্মাণ এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সুনিয়ন্ত্রিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সরকার ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ বা সর্বাত্মক সরকারি পদ্ধতিতে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সমন্বয়ের জন্য তার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি সক্রিয় রয়েছে।
এছাড়া ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশন কমিটি অন রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স’ নামে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সরকার এই সংকট মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হলো আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ (জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার হিসাবে ১২ লাখ) বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো।
তিনি জানান, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়েছিল। অতীতের সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকার আবারও সফল প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকালের মানবিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমাধানের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
তাই জরুরি ত্রাণ সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে দ্রুত একটি রূপান্তরকালীন কৌশলে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোরালো সহযোগিতা প্রয়োজন।
এই সংকট যেন অন্য কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংঘাতের আড়ালে চাপা না পড়ে এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় সক্রিয় থাকে, সে বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দেন। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থাসহ (ইউএনএইচসিআর) সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি আইভো ফ্রেইসেন, বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী সেলের প্রধান মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীনসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধি ও গবেষকরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী।
