রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও দর্শনকে গভীরভাবে অনুধাবন করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো তাঁর লেখা চিঠিপত্র। কবি নিজেই তাঁর বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর গদ্য বা পদ্যে জীবনের সুখ-দুঃখের দিনরাত্রিগুলো যেভাবে ধরা দিয়েছে, তা অন্য কোনো আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে পাওয়া সম্ভব নয়। মৃত্যুর ৮৫ বছর পরেও তাঁর লেখা চিঠিগুলো পাঠ করলে কবির অনুভূতির জগত এবং তাঁর দৈনন্দিন জীবনের নানা খুঁটিনাটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রগুলো যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের এক শুদ্ধতম দর্পণ। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছিলেন নির্মলকুমারী মহলানবিশকে। সংখ্যায় এই চিঠির পরিমাণ পাঁচ শতাধিক। ১৯২৫ সালে শুরু হয়ে ১৯৪১ সালের ৮ জুন পর্যন্ত এই পত্রালাপ অব্যাহত ছিল। রবীন্দ্রনাথ নির্মলকুমারীকে স্নেহের বশে ‘রানী’ বলে সম্বোধন করতেন। যদিও তাঁদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না, তবে চিঠির বিষয়বস্তু ও গভীরতা থেকে তাঁদের মধ্যে এক অনন্য বন্ধুত্বের ও নির্ভরতার সম্পর্ক প্রতীয়মান হয়।
অমিত্রসূদন ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ‘নিজের কথা’ শীর্ষক ৫১১ পৃষ্ঠার সংকলনে এই চিঠিপত্রগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। এই চিঠিগুলোতে রবীন্দ্রনাথের জীবনের বিভিন্ন দিক অত্যন্ত নিপুণভাবে উঠে এসেছে। চিঠির বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল সমসাময়িক রাজনীতি, কবিতা প্রকাশের তাগিদ, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, শারীরিক অসুস্থতা, হোমিওপ্যাথির চর্চা, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো ঘটনা।
টেবিলের ওপর পড়া একফালি রোদ, বৃষ্টির ঝাপটা, ফুলের সৌরভ কিংবা সহকারী বনমালীর গোসলের তাগাদা—সবই তাঁর বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠত। কখনো কখনো একপাটি জুতা হারিয়ে যাওয়া বা ডাকপিয়নের জন্য অপেক্ষার মতো সাধারণ ঘটনাও তাঁর চিঠিতে চমৎকারভাবে স্থান পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ চিঠিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন—কাজের চিঠি এবং অকারণে লেখা অনাবশ্যক চিঠি।
কাজের চিঠির চেয়ে অকারণে লেখা চিঠিগুলোই তাঁর কাছে ছিল বেশি প্রিয়। তিনি মনে করতেন, এসব চিঠি লেখার মাধ্যমে তিনি নিজের মনকে পরিষ্কার করতে পারেন। অনেক সময় উত্তরের প্রত্যাশা না রেখেই তিনি দীর্ঘ চিঠি লিখতেন, যা ছিল তাঁর সঞ্চিত বেদনার প্রকাশ। শান্তিনিকেতন থেকে লেখা এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, চিঠি কলম দিয়ে নয়, বরং লেখনী দিয়ে লেখা উচিত।
তাঁর মতে, চিঠিতে যা লেখা হয় তা পুরোপুরি আপন কথা এবং এটিই প্রকৃত আত্মপ্রকাশ। সাহিত্যের অন্যান্য রচনার তুলনায় চিঠিপত্র ছিল ফরমাশমুক্ত এবং আটপৌরে। তিনি মনে করতেন, চিঠির কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই, এটি কেবল মনের কথা বলার একটি মাধ্যম।
ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রাণু মুখোপাধ্যায়, হেমন্তবালা দেবী এবং নির্মলকুমারী মহলানবিশ—এই চার নারী রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি চিঠি পেয়েছিলেন। ‘নিজের কথা’ গ্রন্থের ভূমিকায় সম্পাদক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন যে, নারীদের লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের যে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ, উচ্ছ্বাস ও অন্তরঙ্গতা লক্ষ্য করা যায়, তা পুরুষদের লেখা চিঠিতে সেভাবে পাওয়া যায় না।
তৎকালীন সময়ে চিঠি পাঠানোর খরচ ছিল পাঁচ পয়সা, তাই রবীন্দ্রনাথ রসিকতা করে চিঠিকে ‘পাঁচ পয়সার নৈবদ্য’ বলে অভিহিত করতেন। সারা জীবন তিনি নিয়মিত চিঠি লেখার জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করতেন। তাঁর কাছে চিঠি লেখা ছিল নিজের সঙ্গেই নিজের কথোপকথন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি চিঠির মাধ্যমে নিজের মনের ভেতরের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য সংগ্রহ করতেন।
তাঁর লেখা প্রতিটি চিঠি যেন এক একটি সময়ের দলিল, যা আজও পাঠকদের কবির সান্নিধ্য লাভের সুযোগ করে দেয়।
