রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালত সাংবাদিক উৎস রহমান হত্যা মামলায় এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। বুধবার ২ সেপ্টেম্বর রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মসিউর রহমান খান এই রায় ঘোষণা করেন। মামলার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত অপর দুই আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির নাম রুবেল হেমরম। তিনি রংপুর জেলার শেখপাড়া ভোগারাম বিল এলাকার সাকলে হেমরমের ছেলে। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শফিকুল ইসলামের ছেলে এলিন এবং রংপুর নগরীর খামারপাড়ার শংকর মোহন্তের ছেলে শুভ কুমার। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাংবাদিক উৎস রহমান নগরীর জিএল রায় রোডে অবস্থিত দৈনিক যুগের আলো পত্রিকা অফিসে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
কাজ শেষে তিনি আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে অফিস থেকে বের হয়ে যান। এরপর সেই রাতে তিনি আর বাসায় ফেরেননি। পরদিন ২৪ ডিসেম্বর সকালে রংপুর নগরীর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের অদূরে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে একটি গাছের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উৎস রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এই ঘটনার পরদিন নিহত সাংবাদিকের মা নুরজাহান বেগম বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত এই রায় প্রদান করেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে আসামি, আইনজীবী এবং নিহত সাংবাদিকের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। মামলার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাদী নুরজাহান বেগম।
রায় ঘোষণার পর তিনি সাংবাদিকদের জানান, এই রায়ে তিনি ন্যায়বিচার পাননি বলে মনে করেন। তিনি আরও জানান, আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই অব্যাহত রাখা হবে। মামলার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় জহিরন আক্তার জুই ওরফে গেদি এবং রিপন মিয়া নামে দুই আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
সাংবাদিক উৎস রহমান হত্যা মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে রংপুরের স্থানীয় পর্যায়ে বেশ আলোচিত ছিল। মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্টরা জানান, রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর উচ্চ আদালতে আপিলের প্রক্রিয়া শুরু হবে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনার পর আদালত এই রায় দিয়েছেন।
আদালত প্রাঙ্গণে রায় ঘোষণার সময় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। নিহত সাংবাদিকের স্বজনরা আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মামলার নথিপত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচারক তার রায় প্রদান করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ এবং বিভিন্ন মহল থেকে বিচারের দাবি জানানো হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলার রায় ঘোষণার মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি ধাপ সম্পন্ন হলো।
তবে বাদীপক্ষের আপিলের সিদ্ধান্তের কারণে বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে ঘটনার সময় যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। সাংবাদিক উৎস রহমানের মৃত্যুর ঘটনাটি তৎকালীন সময়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল।
মামলার রায়ে আদালত মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি খালাসপ্রাপ্তদের বিষয়েও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। বিচারিক আদালতের এই রায় এখন মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হিসেবে বিবেচিত হবে।
