রংপুর নগরীর মাসুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় শান্ত দাস নামে এক মাদক কারবারি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রোববার বিকেলে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক রফিকুল ইসলামের কাছে তিনি এই জবানবন্দি প্রদান করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, শান্ত দাসের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের আগের পরিস্থিতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। জবানবন্দিতে শান্ত দাস জানিয়েছেন, ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে আসামি সিদ্ধার্থ দাস তার কাছে ইয়াবা কিনতে আসেন। সেই সময় সিদ্ধার্থের কাছে টাকা না থাকায় তিনি তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি শান্তর কাছে বন্ধক রাখেন।
সেই মোবাইল ফোনের বিনিময়ে সিদ্ধার্থ শান্তর কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ঘটনার পরের দিন সিদ্ধার্থ সাড়ে তিন হাজার টাকা পরিশোধ করে তার বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ফেরত নিয়ে যান। এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এর আগে শ্মশানের গার্ড বিদ্যুৎ মোহন্ত এবং অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাসের প্রতিবেশী ও বন্ধু সীমান্ত দাস আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা জিন্নাত আলী জানান, আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ঘটনার আগে তারা তাদের বন্ধু সীমান্তের বাড়িতে একত্রিত হয়ে তিনটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। এরপর আরও ইয়াবা সেবনের নেশা থেকে তারা পাশের কামাল কাছনা এলাকায় শান্তর কাছে যান। সেখানে মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে তারা আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন।
এই মাদক সংগ্রহের বিষয়টি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য যে, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাসুয়াপাড়া এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে এবং ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারের পর মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের দায় স্বীকার করেন এবং পরবর্তীতে আদালতে বিস্তারিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। বর্তমানে মামলাটি রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এবং এর পেছনে থাকা অন্যান্য কারণগুলো উদঘাটনে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।
ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যকে এভাবে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও শিক্ষক সমাজ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিদের জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সাথে আর কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তের স্বার্থে এবং মামলার সুষ্ঠু বিচারের লক্ষ্যে গোয়েন্দা পুলিশ সব ধরনের আলামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে। জবানবন্দি প্রদানকারী শান্ত দাস বর্তমানে পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন এবং তার দেওয়া তথ্যগুলো মামলার নথিপত্রের সাথে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে চার্জশিট দাখিলের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
