হাইকোর্ট রবিবার রংপুরের মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) দুই সদস্যের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। একই সঙ্গে আদালত এই মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য পাঁচজনকে খালাস প্রদান করেছেন। বিচারপতি জাফর আহমেদ ও বিচারপতি সাথিকা হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের করা আপিলের শুনানি শেষে এই রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন জেএমবির রংপুর অঞ্চলের কমান্ডার মাসুদ রানা ওরফে মামুন ওরফে মন্ত্রী এবং লিটন মিয়া ওরফে রফিক। অন্যদিকে, খালাস পাওয়া পাঁচজন হলেন জেএমবি সদস্য ইসহাক আলী, সাখাওয়াত হোসেন ওরফে রাহুল, সারোয়ার হোসেন সাবু ওরফে মিজান, উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ডার বিজয় ওরফে আলী ওরফে দর্জি এবং চান্দু মিয়া।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এস এম শাহজাহান ও ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন। এর আগে ২০১৮ সালে রংপুরের বিশেষ জজ আদালত এই হত্যা মামলায় সাতজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিলেন এবং ছয়জনকে খালাস দিয়েছিলেন। বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজন ছিলেন মাসুদ রানা, ইসহাক আলী, লিটন মিয়া, সাখাওয়াত হোসেন, সারোয়ার হোসেন, বিজয় এবং চান্দু মিয়া।
রবিবার হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজনের মধ্যে পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে এবং বাকি দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। বিচারিক আদালত কর্তৃক খালাস পাওয়া ছয়জন আসামি হলেন জেএমবি সদস্য আবু সাঈদ, তৌফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ, সাদাত ওরফে রতন মিয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, বাবুল আক্তার ওরফে বাবুল মাস্টার এবং রাজিবুল ইসলাম মোল্লা ওরফে বাদল ওরফে বাঁধন।
মামলার মোট ১৩ জন আসামির মধ্যে চান্দু মিয়া ও রাজিবুল ইসলাম মোল্লা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের চৈতের মোড় এলাকায় মাজারের খাদেম ৬০ বছর বয়সী রহমত আলীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। স্থানীয় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে এই হামলার শিকার হতে হয়।
ঘটনার পরদিন ১১ নভেম্বর নিহতের ছেলে শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে কাউনিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত শেষে জেএমবি সদস্যদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ রংপুরের বিশেষ জজ আদালত রায় প্রদান করেন, যেখানে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে খালাস দেওয়া হয়েছিল।
সেই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন এবং নিয়ম অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। হাইকোর্ট উভয় পক্ষের শুনানি শেষে রবিবার এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। এই রায়ের ফলে মামলার আইনি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এল। মামলার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, রহমত আলী স্থানীয় একটি মাজারের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জেএমবি সদস্যদের সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়। পুলিশি তদন্তে উঠে আসে যে, পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। বিচারিক আদালতের রায়ের পর থেকে দণ্ডপ্রাপ্তরা কারাগারে ছিলেন। হাইকোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে মামলার দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো।
তবে পলাতক আসামিদের বিষয়ে কোনো নতুন তথ্য পাওয়া যায়নি। আদালত তার রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামির অপরাধের ভয়াবহতা ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। খালাস পাওয়া পাঁচজনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব বা ত্রুটি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মামলার নথিপত্র ও সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট এই রায় দিয়েছেন।
