রংপুরের গঙ্গাচড়ার নবনীদাস গ্রামের মিশুকচালক মোখলেছার রহমান হত্যাকাণ্ডের ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি। গত ২৮ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গঙ্গাচড়ার শান্তিপাড়া এলাকার পাকা সড়কের পাশে মোখলেছারের গলাকাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় পথচারীরা। খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে।
নিহত মোখলেছারের বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। তিনি মিশুক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঘটনার পরদিন ২৯ আগস্ট নিহতের ছেলে মিজানুর রহমান গঙ্গাচড়া মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। মোখলেছারের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষরা পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করেছে।
নিহতের ছোট ভাই শাহিনুর ইসলামের ভাষ্যমতে, ২৬ শতাংশ বসতভিটা নিয়ে প্রতিবেশী জাদু মিয়া, সেকেন্দার, মারজান ও সাদেকুল ইসলামের সঙ্গে মোখলেছারের বিরোধ ছিল। এ নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। সম্প্রতি একটি মামলায় মোখলেছারের পক্ষে রায় আসায় প্রতিপক্ষের লোকজন ক্ষুব্ধ ছিল। শাহিনুর ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, গত ১৩ আগস্ট রংপুর আদালত চত্বরে জাদু মিয়া, সেকেন্দার, মারজান ও সাদেকুল ইসলাম তাঁর ভাইকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিলেন।
এর দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি হত্যার শিকার হন। পরিবারের দাবি, কেবল মিশুক ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেনি, বরং পূর্বশত্রুতার জেরেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। মামলার বাদী মিজানুর রহমান জানান, তাঁর বাবা সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। তিনি আশঙ্কা করতেন যে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে মেরে ফেলতে পারে।
ঘটনার পাঁচ দিন আগে মোখলেছার তাঁর ছেলেকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘দেখেশুনে চলাফেরা করিও, আমাদের ডানে-বাঁয়ে অনেক শত্রু আছে।’ এদিকে, অভিযুক্ত জাদু মিয়া, সেকেন্দার আলী, মারজান ও সাদেকুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জাদু মিয়া জানান, তিনি গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ডবয় হিসেবে কর্মরত।
ঘটনার দিন রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাড়ি ফেরার পর তিনি হত্যাকাণ্ডের খবর পান। জমি নিয়ে বিরোধের কথা স্বীকার করলেও তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস ছবুর জানিয়েছেন, মামলার বাদী যে অভিযোগ লিখে নিয়ে এসেছেন, সেটিই মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে এবং পরিবারের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তবে ছয় দিন পার হলেও পুলিশ এখনো মোখলেছারের ব্যবহৃত মিশুকটি উদ্ধার করতে পারেনি। মোখলেছারের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার চরম সংকটে পড়েছে। পরিবারের ৯ জন সদস্যের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি।
মিশুক চালিয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি তিনি চারটি এনজিও থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এনজিওগুলো ঋণের কিস্তির জন্য চাপ দিচ্ছে। নিহতের মেয়ে মোহসিনা জানান, তাঁর বাবার মৃত্যুর পর থেকে ঘরে খাবার নেই এবং কয়েক দিন ধরে চুলা জ্বলেনি।
প্রতিবেশীরা খাবার দিয়ে সহায়তা করছেন। নিহতের স্ত্রী মোসলেমা বেগম এখন পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁর স্বামীকে খুন করার পর এখন পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তা কে দেবে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত চলমান রয়েছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
