রাতে ঘুমের মাঝে বারবার প্রস্রাবের তাগিদে ঘুম ভেঙে যাওয়া একটি শারীরিক সমস্যা যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় নকচুরিয়া নামে পরিচিত। সাধারণত রাতে এক থেকে দুইবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম থেকে ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়, তবে এর চেয়ে বেশিবার প্রস্রাবের প্রয়োজন হলে তা স্বাস্থ্যগত সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
এই সমস্যার পেছনে বেশ কিছু সাধারণ এবং জটিল কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো শোবার আগে অতিরিক্ত পরিমাণে পানি বা তরল পান করা। ঘুমানোর আগে বেশি তরল গ্রহণ করলে মধ্যরাতে মূত্রথলি দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়, যার ফলে প্রস্রাবের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।
শারীরিক অসুস্থতাও এই সমস্যার একটি বড় কারণ হতে পারে। বিশেষ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি বা ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্করা প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যার ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যায়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ এবং মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণের মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যাগুলোও রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়ার কারণ হতে পারে।
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের শরীরে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। বয়সের সাথে সাথে দেহের অ্যান্টিডিউরেটিক হরমোনের পরিমাণ কমে যায়, যার ফলে রাতে প্রস্রাবের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্রন্থির সমস্যা থাকলে মূত্রথলি সঠিকভাবে খালি হয় না, যা বারবার প্রস্রাবের তাগিদ সৃষ্টি করে।
নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পরবর্তী সময়ে মূত্রথলির কার্যক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে। মূত্রথলি যদি সঠিকভাবে কাজ না করে বা অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে, তবে বারবার প্রস্রাবের তাগিদ অনুভূত হয়। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ওভার-অ্যাকটিভ ব্লাডার বলা হয়।
ওষুধের প্রভাবও এই সমস্যার পেছনে দায়ী হতে পারে। বিশেষ করে মূত্রবর্ধক বা ডাইউরেটিক জাতীয় ওষুধ রাতে সেবন করলে প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই ধরনের ওষুধগুলো শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।
জীবনযাত্রার কিছু অভ্যাস এবং মানসিক অবস্থাও এই সমস্যার প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বা অ্যালকোহল গ্রহণ করলে প্রস্রাবের তাগিদ বাড়ে। এছাড়া ঘুমের সমস্যা এবং অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণেও অনেকে রাতে বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন অনুভব করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়ার সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর ফলে ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে যদি এই সমস্যার পাশাপাশি শরীরে দুর্বলতা বা পা ফোলা থাকার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে তা কোনো গুরুতর রোগের সংকেত হতে পারে।
শরীর থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য বের করার জন্য প্রস্রাব একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু এর অস্বাভাবিকতা শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
