রাজধানীর আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে গত ১২ আগস্ট গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল অভিযান চালায়। এই অভিযানের সময় আটক করা বেশ কয়েকজন নারীর মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরিয়ে তাদের চেহারা দেখাতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের দুজন নারী সদস্য আটক নারীদের জোর করে ধরে মুখ দেখাতে বাধ্য করছিলেন এবং একজন নারী তখন কাঁদছিলেন।
ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের মুখে বলা শোনা যায়, 'সব খোল, সব খোল, এই মাস্ক খোল, ঢাকবি না, ঢাকলে কিন্তু মাইর হবে'র মতো কথা।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, আটক নারীদের মুখ ঢাকতে বাধা দেওয়ার এই নির্দেশ দিয়েছিলেন ডিবি পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির। একটি ভিডিওতে মাস্ক পরা অবস্থায় তাঁকে এই কথা বলতে শোনা যায়। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইলিয়াস কবির। তিনি জানান, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য অনেক সময় মাস্ক সরাতে বলা হতে পারে, তবে কোনো সদস্য তাদের মুখ দেখাতে বাধ্য করেননি।
তিনি দাবি করেন, এই ধরনের কাজ মিডিয়ার সদস্যরা ভিউ পাওয়ার জন্য করতে পারেন। ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরানোর দৃশ্য দেখা গেলেও তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করা হয়নি এবং মানুষ হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ছোটখাটো ভুল হতে পারে।
মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা পুলিশের এই আচরণকে বেআইনি এবং নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান বলেন, কোনো নারী অপরাধ করলে তার বিচার হবে এবং আদালত তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে শাস্তি দেবেন, কিন্তু পুলিশ বিচারের আগেই এক ধরনের শাস্তির আয়োজন করছে যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, আইন এই ধরনের আচরণ অনুমোদন করে না এবং উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, এই বেআইনি চর্চা বন্ধ করা প্রয়োজন।
এই ঘটনার পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল, পানশালা বা ফ্ল্যাটে অভিযানের সময় ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশ ও ইউটিউবারদের সূত্রে জানা গেছে, অনেক সময় অভিযানের আগে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ইউটিউবারদের ডেকে নেন। ইউটিউবার এবং কিছু সংবাদমাধ্যম এসব ভিডিও প্রচার করে ভিউ অর্জন করে এবং সেখান থেকে আয় করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, আবাসিক হোটেল বা পানশালায় অভিযান মূলত বোঝাপড়া ও লেনদেনের ঝামেলা হলে হয়। তিনি মনে করেন, পুলিশের কোনো অভিযানে ইউটিউবার বা সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া উচিত নয় এবং পুলিশ অভিযানের পর সংবাদ সম্মেলন করতে পারে। তিনি আরও বলেন, ভিউয়ের জন্য কিছু সাংবাদিক অনৈতিক বা বেআইনি কাজে অংশগ্রহণ করছেন, যা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। এছাড়া জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে সদস্যদেশগুলোকে নির্যাতন এবং অমানবিক ব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে। ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হওয়া কোনো ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবি আটক ব্যক্তির মুখমণ্ডল অস্পষ্ট বা ব্লার করে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর চর্চা শুরু করলেও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কিছু কর্মকর্তা তা মানছেন না এবং বরং মুখ দেখাতে বাধ্য করছেন।
