রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় একটি মেস থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক নারী শিক্ষার্থীকে র্যাবের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। রোববার সকালে সাদাপোশাকের একদল ব্যক্তি ওই শিক্ষার্থীর মেস থেকে তাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তোলার চেষ্টা করেন। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর নাম মমতাজ আরা বর্ষা, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
ঘটনার সময় ওই ব্যক্তিদের কাছে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা বৈধ পরিচয়পত্র না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয়দের বাধার মুখে তারা ওই শিক্ষার্থীকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে সূত্রাপুর থানা-পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, ওই ব্যক্তিরা র্যাব-২-এর সদস্য ছিলেন। ঘটনার পর বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী মমতাজ আরা বর্ষা অভিযোগ করেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে তার বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র্যাবের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই ঘটনার অবতারণা করেছেন।
বর্ষা জানান, চলতি বছরের মে মাসে তার ছোট বোনের সঙ্গে সুমন মিয়ার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে সুমন মিয়া তাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। গত আগস্ট মাসে দিনাজপুর জজকোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। বর্ষার দাবি, সেই মামলার প্রতিশোধ নিতেই সুমন মিয়া তার পূর্বের কর্মস্থল র্যাবের পরিচয় ব্যবহার করে তাকে অপহরণের চেষ্টা করেছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আরও জানান, রোববার খুব ভোরে সাদাপোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়েন। তারা নিজেদের র্যাব সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও কোনো ধরনের আইডি কার্ড বা আদালতের ওয়ারেন্ট দেখাতে ব্যর্থ হন। এ সময় তারা অশালীন ভাষায় কথা বলেন এবং কোনো নারী সদস্য ছাড়াই জোরপূর্বক মেস তল্লাশি করেন।
ওয়ারেন্ট ছাড়া তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন। খবর পেয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা দেখেন ওই শিক্ষার্থীকে গাড়িতে তোলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা প্রক্টর অফিস ও উপাচার্যকে অবহিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তারেক বিন আতিক আরও জানান, ওই ব্যক্তিরা শুরুতে ভুল করে সেখানে আসার কথা বললেও পরে চুরির মামলার আসামি ধরার দাবি করেন।
তবে তারা কোনো পরিচয়পত্র বা যোগাযোগের নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির জানান, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা হবে, তবে কোনো অনিয়ম বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এমন কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়।
জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে যান এবং সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করেন। পরবর্তীতে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপস্থিতিতে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়। সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার নিশ্চিত করেছেন যে, ওই ব্যক্তিরা মোহাম্মদপুর র্যাব-২-এর সদস্য ছিলেন।
তিনি জানান, একটি মামলার অভিযোগে তারা ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিলেন, তবে পরবর্তীতে জানা যায় এটি একটি পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত মামলা। ঘটনার পর ওই শিক্ষার্থীকে না নিয়েই তারা চলে যান। মামলার বিস্তারিত তথ্যের জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
