মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত হাম হাম জলপ্রপাতে বিরল প্রজাতির সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙ বা গ্রিন কাসকেড ফ্রগ (Odorrana livida)-এর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের প্রাণিকুলের রেডলিস্ট হালনাগাদকরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে পরিচালিত এক মাঠ জরিপে গবেষক দল এই ব্যাঙের ব্যাঙাচি শনাক্ত করেন। বন অধিদপ্তরের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন, বাংলাদেশের বাস্তবায়নে এই জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
গবেষক দলের সদস্যরা ১১ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মৌলভীবাজার ও সিলেটের মিশ্র চিরহরিৎ বনাঞ্চলে এই জরিপ পরিচালনা করেন। হাম হাম জলপ্রপাত এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় সেখানে পৌঁছাতে গবেষক দলকে পাঁচ থেকে ছয়টি পাহাড় ও পিচ্ছিল পাথুরে ছড়া অতিক্রম করতে হয়েছে। কুরমা চা-বাগান এলাকা থেকে প্রায় ২০০ মিটার উচ্চতার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে জলপ্রপাতের পাদদেশে পৌঁছাতে হয়।
গবেষক দলের সদস্য ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ১৪ জনের দলটি সেখানে উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করেন। জরিপ চলাকালীন দিনের বেলা পর্যটকদের ব্যাপক আনাগোনা ও কোলাহলের কারণে পূর্ণবয়স্ক ব্যাঙের দেখা না মিললেও বন বিভাগের কর্মী শিবলি একটি ব্যাঙাচি খুঁজে পান।
পরে ব্যাঙবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাসান সেটিকে সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙের ব্যাঙাচি হিসেবে নিশ্চিত করেন। এর আগে ২০১২ সালে তানিয়া খান ও মুনির খান এই অঞ্চলে প্রজাতিটির প্রথম সন্ধান পেয়েছিলেন, তবে সে সময় তা বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত হয়নি। পরবর্তীতে ২০২১ সালে গবেষকদের একটি দল হারপেটোলজি নোটস জার্নালে প্রজাতিটির প্রথম বৈজ্ঞানিক নথি প্রকাশ করেন।
বর্তমান জরিপে ব্যাঙ ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি, ড্যামসেলফ্লাই, ঘাসফড়িং, টাইগার বিটল, মাকড়সা ও মিলিপিডসহ নানা কীটপতঙ্গের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। সরীসৃপের মধ্যে স্কিংক ও লিজার্ড এবং উভচরের মধ্যে কটকটি ব্যাঙের দুটি প্রজাতি পাওয়া গেছে। পাখির তালিকায় বুলবুল, টুনটুনি, পাতা ফুটকি, কাঠঠোকরা, ধনেশ, ফিঙে, ঘুঘু, সুইচোরা ও ফুলঝুরি উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া পাহাড়ি নীল-ঘাড় সুমচা বা ব্লু-নেইপড পিটারের একটি বাসায় পাঁচটি ডিম পাওয়া গেছে। গবেষক দলের মতে, হাম হাম জলপ্রপাত কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র। জলপ্রপাতের চারপাশের বনভূমি, মাটির স্তর ও গাছের শিকড় বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ছড়ার প্রবাহ বজায় রাখে।
বর্তমানে পর্যটকদের অতিরিক্ত চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে এই বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ছে। গবেষকরা জলপ্রপাতের পরিবেশ রক্ষায় বিপজ্জনক অংশে পরিবেশবান্ধব হ্যান্ডরেইল স্থাপন, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইডের ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করেছেন। এছাড়া পাহাড়ি এলাকায় অবৈধভাবে গাছ কাটা, বাঁশ ও বেত আহরণ বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
পর্যটকদের জন্য জলপ্রপাতের প্রবেশপথে প্রকৃতির ক্ষতি না করার বিষয়ে সচেতনতামূলক নির্দেশনা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গবেষক দলের মতে, জলপ্রপাতের সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি এর চারপাশের অরণ্য ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা জরুরি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই প্রাকৃতিক সম্পদের দেখা পায়। দুর্গম এই পথে যাতায়াতের জন্য পর্যটকদের অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে রাখা, ভালো গ্রিপযুক্ত জুতা ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোবাইল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা থাকায় জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পর্যটন অর্থনীতির বিকাশের পাশাপাশি বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
