মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় কৃষকদের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত দুটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থানীয় কৃষকদের কোনো কাজেই আসছে না। প্রায় ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনাগুলো বর্তমানে কৃষকদের পরিবর্তে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাগানমালিকদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি সাধারণ মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে প্রায় ৫ লাখ টাকা এবং সৌরচালিত প্রতিটি হিমাগার নির্মাণে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সিংগাইরের মেদুলিয়া ও দক্ষিণ জামশা এলাকায় স্থাপিত এই হিমাগারগুলো উদ্বোধনের পর থেকেই নানা অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারে বিক্রি হয়ে যায়, ফলে হিমাগারে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তাদের নেই।
মেদুলিয়া গ্রামের কৃষক আশরাফুল হক জানান, ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় তাদের উৎপাদিত সবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্য দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়, তাই হিমাগারের প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদিকে, দক্ষিণ জামশা এলাকার হিমাগারটি স্থানীয় এক বাগানমালিক ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জিহাদ আলী জানান, উদ্বোধনের পর থেকে কোনো কৃষককে সেখানে পণ্য সংরক্ষণ করতে দেখা যায়নি, বরং আতিক নামের এক ব্যক্তি তার বাগানের ফল সংরক্ষণের জন্য এটি ব্যবহার করছেন।
হিমাগার ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে আতিক জানান, কৃষকরা পণ্য রাখতে আগ্রহী না হওয়ায় তিনি এটি ব্যবহার করছেন। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিষয়টি নিয়েও কৃষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। মেদুলিয়া প্রকল্পের সদস্য আশরাফুল হক জানান, প্রকল্পের ১৫ জন সদস্যকে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অর্থ দিতে হয়েছে।
বিল পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় এক পর্যায়ে হিমাগারটি দুই মাস বন্ধও ছিল। বর্তমানে ব্যবসায়ীরা এটি ব্যবহার করায় তারাই বিদ্যুৎ বিল বহন করছেন, তবে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না। হিমাগার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কারিগরি জ্ঞানের অভাবও একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
জায়গীর গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান জানান, তিনি গত ঈদের আগে ১২ ক্যারেট টমেটো হিমাগারে রেখেছিলেন, কিন্তু কয়েক দিন পর সেগুলো বের করে দেখেন সব নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি স্বীকার করেন যে, পণ্য সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। এই অভিজ্ঞতার পর কৃষকদের মধ্যে হিমাগার ব্যবহারের আগ্রহ আরও কমে গেছে।
সিংগাইর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কিশোর আহমেদ দাবি করেন যে, কৃষকদের পণ্য দ্রুত বিক্রি হয়ে গেলেও হিমাগারগুলো অকেজো নয়। তবে প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাসরুর জানিয়েছেন, যদি মেদুলিয়ার হিমাগারটি কৃষকদের কোনো উপকারে না আসে, তবে তা সরিয়ে অন্য কোনো এলাকায় স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এই সমন্বয়হীনতা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। কৃষকদের মতে, এই ধরনের স্থাপনা কৃষকের জমির পাশে না রেখে যদি বড় কোনো বাজারে স্থাপন করা হতো, তবে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হতে পারতেন। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত এই অবকাঠামোগুলো বর্তমানে কৃষকের উপকারের চেয়ে বিদ্যুৎ বিলের বোঝা এবং অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
