ঢাকার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা নাগরিকদের হয়রানি, ঘুষ এবং দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই নির্দেশনা প্রদান করেন। সভায় সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক সভায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা নাগরিকরা কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নিতে আসেন না, বরং তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য সেবা গ্রহণ করতে আসেন। তাই নাগরিকদের যথাযথ সেবা প্রদান করা সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এবং নৈতিক কর্তব্য। কোনো অবস্থাতেই ভূমিসেবা প্রদানে গাফিলতি বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
ফরিদা খানম কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যে, অফিসে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থেকে দ্রুত সেবা কার্যক্রম শুরু করতে হবে। নামজারি, খতিয়ান এবং মিউটেশনসহ ভূমি-সংক্রান্ত যাবতীয় আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ঘুষ গ্রহণ, নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল আটকে রাখা কিংবা অকারণে নাগরিকদের হয়রানি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দালালদের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার প্রবণতা রোধে তিনি কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দালালদের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভূমি অফিসগুলোকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, নাগরিকদের সরাসরি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
কোন সেবার জন্য কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন, সরকারি ফি কত এবং সেবা পেতে কত সময় লাগবে—এই তথ্যগুলো নাগরিকদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়া ভূমি কর্মকর্তাদের নাগরিকদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে জমি জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
তাই ভূমি অফিসে এসে কেউ যেন অপমানিত বা হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। মতবিনিময় সভায় ঢাকা জেলার ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের চিত্রও তুলে ধরা হয়। সভায় জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা জেলায় সাধারণ খাতে ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ ৮৪ কোটি ৭০ লাখ ৭২ হাজার ২৮০ টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এর বিপরীতে ৯৩ কোটি ৬৮ লাখ ৪০ হাজার ৭৮৬ টাকা আদায় হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১১০ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া সংস্থার ভূমি উন্নয়ন কর থেকে ২৬ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ১৬০ টাকা এবং অর্পিত সম্পত্তির লিজমানি হিসেবে ৮ কোটি ৭৬ লাখ ৮৬ হাজার ১২৫ টাকা আদায় হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে এই সাফল্যের জন্য জেলা প্রশাসক সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং তহসিলদারসহ সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার কারণেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। সভায় জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ভূমি প্রশাসনের কাজ কেবল ফাইল নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের সমস্যার সমাধান করাই মূল লক্ষ্য।
নাগরিকরা যাতে কোনো দালালের সহায়তা ছাড়াই সহজ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সেবা পেতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেবা নিতে আসা কোনো মানুষকে যেন দিনের পর দিন ঘুরতে না হয় এবং কাজ শেষে তারা যেন সন্তুষ্ট হয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্য কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ভূমি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায় এবং নাগরিকদের ভোগান্তি কমানোর বিভিন্ন কৌশল নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
