বাংলাদেশে বর্তমানে নাগরিক সেবার মান অত্যন্ত নিম্নমুখী। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা এবং সরকারি দপ্তরে ঘুষ ছাড়া সেবা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাধারণ মানুষকে সরকারি দপ্তরে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ঢাকার একটি ভূমি অফিসে কর প্রদানের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই দুর্নীতির চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও ভূমি অফিসে গিয়ে সাধারণ মানুষকে সার্ভার ডাউন থাকার অজুহাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এক পর্যায়ে অফিসের কর্মচারীরা সরাসরি ঘুষ দাবি করে এবং টাকা দিলে মুহূর্তের মধ্যেই সার্ভার সচল হয়ে যায়। এই ঘুষের টাকা কেবল নিচু পদের কর্মচারীদের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল চেইন বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওপরের মহলেও পৌঁছে যায়।
সরকারি দপ্তরে দারোয়ান থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানো সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন। ঘুষ ছাড়া কাজ না হওয়ার এই সংস্কৃতি এখন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি শিক্ষকদের অবসরভাতা পেতে বছরের পর বছর দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। অডিট আপত্তির নামে ফাইল আটকে রেখে ঘুষ দাবি করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা বা ঢাকায় শিক্ষা ভবনে গিয়েও কোনো সমাধান পান না। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত অনেক সরকারি দপ্তরের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশাল ভবন ও বিপুল জনবল থাকা সত্ত্বেও এসব দপ্তর থেকে সাধারণ মানুষ কোনো সুফল পাচ্ছে না। এসব দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছাড়া অন্য কেউ লাভবান হচ্ছে না।
অতীতে বিভিন্ন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে শিক্ষা বিভাগসহ বেশ কিছু সরকারি দপ্তরকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা বরাবরই এসব প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাক লক্ষ্য করা যায়। ক্ষমতায় থাকা দলগুলো প্রায়ই আগের সরকারের দুর্নীতি ও অপচয়ের দোহাই দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করে।
জনগণের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় না। ১৯৭২ সালে তৎকালীন সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানালেও বাস্তবে লুটপাট, চোরাচালান ও মজুতদারি বন্ধ হয়নি। এর ফলে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকে বর্তমান প্রশাসন কোনো শিক্ষা নিচ্ছে না বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া প্রশাসনিক কারণে অনেক কর্মকর্তাকে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করে বসিয়ে রাখা হয়। তারা কোনো কাজ না করেও নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, যা রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের আর্থিক অপচয়। দক্ষ জনবলকে কাজে না লাগিয়ে বসিয়ে রাখা বা রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি দেওয়ার এই সংস্কৃতি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সরকারি দপ্তরে কাজের অভাব এবং দুর্নীতির এই চক্র ভাঙতে কোনো সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন তারা পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, জনগণের অসন্তোষ একসময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তবুও নীতিনির্ধারকরা এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
সরকারি দপ্তরের এই অকার্যকারিতা এবং দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান যদি জনসেবায় ব্যর্থ হয়, তবে তাদের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ খোলা নেই।
