ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়াকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তাঁকে এই সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রদান করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি পরবর্তী পাঁচ বছর অথবা ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত, যেটি আগে ঘটবে, সেই সময়কাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।
সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আমলাতন্ত্রের বাইরে থেকে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর পদত্যাগের পর এবার একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়াকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো।
পরপর দুইবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি পিএসসির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে একটি নতুন ধারার ইঙ্গিত দেয়। পিএসসির মূল কাজ হলো রাষ্ট্রের জন্য যোগ্য জনবল বাছাই করা। বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তরুণদের কাছে এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন চাকরিপ্রার্থী যখন বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন, তখন তিনি প্রত্যাশা করেন যে তাঁর মেধা ও যোগ্যতাই মূল্যায়িত হবে।
রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান বা অন্য কোনো প্রভাব যেন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটি নিশ্চিত করাই পিএসসির প্রধান দায়িত্ব। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষা শেষ করতে দীর্ঘসূত্রতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং অনিয়মের অভিযোগ চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন চেয়ারম্যানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিষ্ঠানটির প্রতি চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া আইন বিষয়ের অধ্যাপক হওয়ায় তাঁর কাছ থেকে স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে শক্ত অবস্থান প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পিএসসির কাজের কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায্যতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, যা আইনের একজন বিশেষজ্ঞের জন্য বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
তবে কেবল শিক্ষক বা আমলা পরিচয় দিয়ে কোনো ব্যক্তির সক্ষমতা বিচার করা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও সফলতার জন্য চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বাধীনতা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অযাচিত প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা।
পিএসসির নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রশাসনিক বলয়ের বাইরে গিয়ে চিন্তা করার এই প্রক্রিয়াটি ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই নিয়োগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নতুন চেয়ারম্যানের কর্মপদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ওপর। যদি একজন মেধাবী তরুণ কোনো ধরনের প্রভাব বা পরিচয় ছাড়াই কেবল নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পান, তবেই এই নিয়োগের উদ্দেশ্য সফল হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়ার সামনে এখন প্রতিষ্ঠানটিকে একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্থায় রূপান্তর করার কঠিন পরীক্ষা রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা অর্জনই হবে তাঁর মেয়াদের প্রধান লক্ষ্য।
