বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানির প্রথম প্রযোজনা মলুয়া মঞ্চস্থ হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আয়োজিত এই নাটকের প্রদর্শনীতে দর্শকের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত মৈমনসিংহ গীতিকার জনপ্রিয় পালা অবলম্বনে নির্মিত এই নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন সাইফুল জার্নাল। নাটকটি শুরু হওয়ার আগে দর্শকদের হল থেকে বের হওয়ার সুযোগ না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
মলুয়া ও চাঁদ বিনোদের প্রেমকাহিনি নিয়ে নাটকটির মূল পটভূমি আবর্তিত হয়েছে। গল্পের শুরুতে তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের থাকলেও গ্রামের প্রভাবশালী কাজির কুদৃষ্টির কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। মলুয়াকে পাওয়ার জন্য কাজি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন এবং বিনোদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে বিনোদকে বন্দি করা হয় এবং মলুয়াকে দেওয়ানের হাওলিতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
মলুয়া তার বুদ্ধি ও সাহসিকতার মাধ্যমে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। তবে গ্রামে ফেরার পর মলুয়াকে সামাজিক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। সমাজের মানুষ তাকে সন্দেহভাজন ও অপয়া হিসেবে চিহ্নিত করে এবং চরিত্রহীনতার অপবাদ দেয়। বিনোদের সংসারেও মলুয়াকে দাসীর মতো জীবনযাপন করতে হয়। পরবর্তীতে বিনোদ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হলে মলুয়া তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন।
এই পর্যায়ে এসে নাটকটি কেবল প্রেমের গল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে নারীর ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আত্মমর্যাদার লড়াইয়ের আখ্যান হয়ে ওঠে। মলুয়া চরিত্রে অভিনয় করেছেন হুমায়রা স্নিগ্ধা, প্রেমা ও নানজীবা শৈলী। একই চরিত্রে তিনজন শিল্পীর অভিনয় প্রযোজনাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। চাঁদ বিনোদ চরিত্রে হাসনাত রিপন অভিনয় করেছেন।
এছাড়া প্রিয়ম মজুমদার, শাহরিয়ার সজীব, পি কে ফজল, গোপী দেবনাথ, ধ্রুব, অরিন, শাহীন সাইদুর ও নুসরাত জাহান ইরা বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। নাটকের কোরিওগ্রাফি, আলোক পরিকল্পনা, পোশাক ও মঞ্চসজ্জা দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করেছে। নাটকের শেষে কলাকুশলীরা গানের সঙ্গে মঞ্চ প্রদক্ষিণ করেন এবং দর্শকরা করতালি দিয়ে তাদের অভিবাদন জানান।
প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন বর্ষীয়ান চলচ্চিত্র প্রযোজক হাবিবুর রহমান। তিনি নাটকটির প্রশংসা করে বলেন, ঢাকায় মলুয়া যতবার মঞ্চস্থ হবে, তিনি ততবারই তা দেখবেন। শিল্পকলা একাডেমিতে প্রতি মাসে ৬৫ থেকে ৭০টি নাটকের প্রদর্শনী হলেও থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানির এই নতুন প্রযোজনাটি দর্শকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। এর আগে স্টুডিও থিয়েটার হল ও বনানীর যাত্রা বিরতিতে নাটকটির প্রদর্শনী হয়েছে এবং প্রতিটি প্রদর্শনীই হাউসফুল ছিল।
নির্মাতা সাইফুল জার্নাল জানান, পুরোনো পালার কাঠামোর সঙ্গে সমকালীন উপাদানের সংমিশ্রণে ফোক ফিউশন ধারায় নাটকটি নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে যখন সমাজ ও মানবিকতা অবহেলার শিকার হচ্ছে, তখন মলুয়ার মতো চরিত্রগুলোই প্রতিবাদ করতে ও মাথা তুলে দাঁড়াতে শেখায়। থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানি মূলত কয়েকটি নাট্যদল ও দুটি ব্যান্ডের শিল্পীদের যৌথ উদ্যোগে গঠিত একটি সংগঠন।
নাটকটি দেখার জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে দর্শকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায় এবং হল পূর্ণ থাকায় টিকিট পেতেও অনেককে বেগ পেতে হয়। দর্শকদের মধ্যে তরুণদের পাশাপাশি বয়োজ্যেষ্ঠ ও পরিবারসহ আসা মানুষের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। নাটকের প্রতিটি প্রদর্শনী হাউসফুল হওয়া নতুন একটি দলের জন্য বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মলুয়া চরিত্রটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের নারী নয়, বরং অনেক নারীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে মঞ্চে ফুটে উঠেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীত ও শরীরী ভাষার ব্যবহার নাটকটিকে দর্শকদের কাছে উপভোগ্য করে তুলেছে। সব মিলিয়ে মলুয়া নাটকটি শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চে একটি সফল সংযোজন হিসেবে সমাদৃত হয়েছে।
