বাংলাদেশে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী ও শিশু উন্নয়ন, মানবাধিকার, সংস্কৃতি এবং ক্রীড়াসহ বিভিন্ন মানবিক সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে প্রতিবছর অসংখ্য ব্যক্তি ও সংগঠন ‘ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাবে অনেক উদ্যোক্তা আইনি জটিলতার সম্মুখীন হন।
বাংলাদেশে ‘ফাউন্ডেশন’ নামে পৃথক কোনো নিবন্ধন আইন নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানের আইনগত পরিচয় নির্ধারিত হয় সেটি কোন আইনের অধীনে নিবন্ধিত হয়েছে তার ওপর। নামের শেষে ‘ফাউন্ডেশন’ শব্দটি ব্যবহার করলেই কোনো প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে ফাউন্ডেশন হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। জনকল্যাণমূলক ও অলাভজনক সংগঠনের জন্য প্রচলিত গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামোর একটি হলো সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০।
এই আইনের আওতায় শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প, সমাজকল্যাণ এবং অন্যান্য জনহিতকর উদ্দেশ্যে সংগঠন গঠন ও নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। নিবন্ধনের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান স্বতন্ত্র আইনগত পরিচয় লাভ করে, যার ফলে প্রতিষ্ঠান নিজ নামে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, সম্পদ অর্জন, চুক্তি সম্পাদন এবং দাতা সংস্থার সহায়তা গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করে।
নিবন্ধন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন, কারণ অনেক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে অনাগ্রহী। সাধারণত কমপক্ষে সাতজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে একটি সোসাইটি গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের প্রত্যেককে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে একমত থাকতে হয় এবং গঠনতন্ত্র ও নিবন্ধনসংক্রান্ত দলিলপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নির্বাচনের সময় তাদের সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দায়িত্বশীলতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য ও কার্যপরিধি নিবন্ধনের আগেই সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। উদ্দেশ্য অবশ্যই জনকল্যাণমূলক এবং অলাভজনক হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের কোনো আয় বা সম্পদ সদস্যদের ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।
অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো জনস্বার্থে তার সম্পদের ব্যবহার। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নাম নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন নাম নির্বাচন করতে হবে যা অন্য কোনো নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে এবং রাষ্ট্র, আইন বা জনস্বার্থের পরিপন্থী না হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের সফলতা অনেকাংশে তার গঠনতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে।
নিবন্ধনের পূর্বে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংঘ স্মারকলিপি (এমওএ) এবং রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন প্রস্তুত করা উচিত। এমওএ-তে প্রতিষ্ঠানের নাম, নিবন্ধিত কার্যালয়ের ঠিকানা, উদ্দেশ্য এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের পরিচয় উল্লেখ থাকে। অন্যদিকে রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনে সদস্যপদ, নির্বাহী কমিটির গঠন, কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব, সভা আহ্বানের নিয়ম, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বিলুপ্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অনেক আবেদনকারী অন্য প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্র হুবহু অনুলিপি করে জমা দেন, যা একটি গুরুতর ভুল। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও প্রশাসনিক কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় গঠনতন্ত্র সেই অনুযায়ী প্রণয়ন করা উচিত। নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্র, সংঘ স্মারকলিপি, রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, কার্যালয়ের ঠিকানার প্রমাণপত্র এবং সরকারি ফি পরিশোধের প্রমাণ প্রয়োজন হয়।
আবেদন পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ দলিলপত্র ও প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য পরীক্ষা করে। কোনো তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে আবেদনকারীকে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। নিবন্ধন সনদ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত দায়িত্ব শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা, টিন গ্রহণ, নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাহী কমিটির সভা আয়োজন করা বাধ্যতামূলক।
সভার কার্যবিবরণী ও হিসাবপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। এছাড়া বিদেশি অনুদান গ্রহণের পরিকল্পনা থাকলে এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হয়। আইনি জটিলতা এড়াতে আবেদন দাখিলের আগে প্রতিটি দলিল একাধিকবার যাচাই করা এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। একটি আইনসম্মত ও সুশাসিত ফাউন্ডেশন কেবল সমাজসেবার বাহন নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণের শক্তিশালী হাতিয়ার।
