২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১,৪০০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তৎকালীন সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সরকার গঠনের পর বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি এই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে গণভোটের পরও সংস্কারের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ করে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন এবং সনদের নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ নিয়ে বিরোধী পক্ষগুলো আপত্তি জানিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা ও তার সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রমাণের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে, তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণে তার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন ও অস্বস্তি লক্ষ্য করা যায়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস ঘটছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ফেরত পাঠানোর দাবি এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ ও আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ প্রভাবিত হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সংবিধান, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক অধিকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক কেবল বাংলাদেশের জনগণ। ১৯৭২ সালের সংবিধান বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ঐতিহাসিক ভিত্তি হলেও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
জনসংখ্যা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের বিবর্তন ঘটেছে। তাই সংবিধানের যে বিধানগুলো বর্তমান সময়ের জন্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টিও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্বের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাষ্ট্রীয় আনুগত্য ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল কেবল শাসক পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন। যদি ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, তবে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
জুলাই সনদের সফল বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা দলের ওপর নির্ভর না করে এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর নজর রাখা এবং গঠনমূলক প্রশ্ন করা।
গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়, বরং নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রূপরেখা কোনো ব্যক্তি বা বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর না করে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদী এবং এতে প্রতিটি নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রশ্ন করা বন্ধ না করাই হলো প্রকৃত জাগরণের লক্ষণ। পর্দা ওঠার আগেই মঞ্চের পেছনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবর্তনের হিসাব রাখা এখন সময়ের দাবি।
