ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ের আগে হবু বরের জন্য কনেকে দেখে নেওয়া শুধু জায়েজই নয়, বরং এটি একটি সুন্নাত কাজ। বিয়ের আগে কনেকে দেখে নেওয়ার বিষয়ে নবীজি (সা. ) তার সাহাবিদের উৎসাহিত করতেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা. ) থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, আল্লাহর রাসুল (সা.
) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ইচ্ছা করেন, তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেওয়া উচিত যা তাকে বিয়েতে আগ্রহী করে তোলে। এই বিধানটি মূলত হবু বরের জন্য প্রযোজ্য, যিনি সরাসরি বিয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুগিরা বিন শোবা (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি যখন এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার কথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানান, তখন তিনি তাকে কনেকে দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
রাসুল (সা. ) বলেছিলেন, এই দেখা দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা ও প্রণয় গভীর হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে এই বিশেষ অনুমতির পরিধি কেবল হবু বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিয়ের আগে কনেকে পর্দা বা হিজাবহীন অবস্থায় দেখার বৈধতা শুধুমাত্র সেই পুরুষের জন্যই রয়েছে, যিনি নিজে বিয়ে করতে ইচ্ছুক।
বরের বাবা, দাদা, ভাই, বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষের জন্য বিয়ের আগে কনেকে দেখা জায়েজ নয়। সুতরাং, বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার আগে বরের বাবার সামনে কনের পর্দা রক্ষা না করে যাওয়া ইসলামি বিধান অনুযায়ী বৈধ নয়। বিয়ের আকদ বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর কনে ও বরের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বৈবাহিক সূত্রে মাহরাম হয়ে যান।
তখন তাদের জন্য কনেকে দেখা শরিয়তসম্মত হয়। ইসলামে পর্দা একটি ফরজ বা বাধ্যতামূলক বিধান। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই পর্দা রক্ষা করা এবং দৃষ্টি সংযত রাখা অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনের সুরা নুরের ৩০ ও ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিন পুরুষ ও নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখার এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নারীরা তাদের সৌন্দর্য কেবল নির্দিষ্ট কিছু আত্মীয় বা মাহরাম ব্যক্তিদের সামনেই প্রকাশ করতে পারবেন। এই তালিকায় স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজ ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই ও বোনের ছেলেসহ নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। বিয়ের আগে বরের বাবা কনের জন্য মাহরাম নন, তাই তার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা শরিয়তসম্মত নয়।
পুরুষের জন্য নিজের চরিত্র হেফাজতের পাশাপাশি দৃষ্টির হেফাজত করা ফরজ। কোনো গায়রে মাহরাম নারীর শারীরিক সৌন্দর্যের দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকিয়ে থাকা বা দৃষ্টিপাত করা ইসলামে হারাম বা নিষিদ্ধ। যদি ভুলক্রমে কোনো নারীর ওপর দৃষ্টি পড়ে যায়, তবে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি নত করে ফেলতে হবে।
ভুলক্রমে দৃষ্টি পড়ে যাওয়ার পর পুনরায় তাকানো বা দৃষ্টি সরিয়ে না নেওয়া গুনাহের কাজ হিসেবে গণ্য হয়। বুরায়দা ইবনে আল-হাসিব (রা. ) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা. ) আলী (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, দৃষ্টির পর পুনরায় দৃষ্টি ফেলো না। অনিচ্ছাকৃতভাবে যে দৃষ্টি পড়ে যায় তার জন্য ক্ষমা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বিতীয়বার তাকানোর জন্য কোনো ক্ষমা নেই।
সুতরাং, বিয়ের আগে কনে দেখার ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের এই সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও পর্দার বিধানগুলো মেনে চলা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। বিয়ের প্রস্তাবের প্রাথমিক পর্যায়ে বরের বাবা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের কনে দেখার কোনো সুযোগ শরিয়তে রাখা হয়নি। বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এই মাহরামের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং তখন পর্দা সংক্রান্ত বিধানগুলো শিথিল হয়।
