বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউপির যামিনী পাড়া এলাকায় গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে জুম চাষিদের পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। সবুজ পাহাড়ের ঢালে সোনালি রঙের পাকা ধানের আভা দেখা যাচ্ছে এবং চাষিরা তাদের ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ধানের পাশাপাশি জুমে আবাদ করা অন্যান্য সাথি ফসল সংগ্রহের কাজও চলছে।
চলতি বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে জুমের ধানের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সব জায়গায় বৃষ্টিপাত সমান না হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় ধান পাকার সময়ে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। যারা বৈশাখ মাসের শুরুতে প্রথম বৃষ্টির পর বীজ বপন করেছিলেন, তাদের ধান আগে কাটার উপযোগী হয়েছে।
জুম চাষি রিং লট ম্রো জানিয়েছেন, তিনি তিন একর পাহাড়ি জমিতে তিন আড়ি বীজের ধান দিয়ে চাষ করেছেন। তিনি জানান, এবার জুমের ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে এবং তিনি এই ফলন নিয়ে সন্তুষ্ট। রিং লট ম্রো আশা করছেন যে, তার তিন একর জমি থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান পাওয়া যাবে।
ফলন আরও ভালো হলে এই পরিমাণ আড়াইশ আড়ি পর্যন্ত হতে পারত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশে ২৫ বছর চাকরি করার পর চলতি বছরের জুন মাসে অবসর নেওয়া রিং লট ম্রো এখন তার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী পেশা জুম চাষে ফিরে এসেছেন। তিনি জানান, জুমে শুধু ধান নয়, বরং বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ এবং রোজেলাসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের সাথি ফসল উৎপাদিত হয়।
তার মতে, জুম চাষের ফলে প্রয়োজনীয় সবজি পাওয়া যায় বলে বাজার থেকে শুধু লবণ এবং নাপ্পি নামের এক ধরনের শুঁটকি কিনতে হয়।
নারী শ্রমিক সংডং ম্রো জানান, জুম চাষ তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য এবং জীবনধারণের প্রধান উৎস। তিনি জানান, ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, মারফা, বেগুন, ভুট্টা, তিল, মরিচ এবং ঢেঁড়সসহ ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়। এই ফসলগুলো নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে তারা অর্থ উপার্জন করেন।
জুম চাষ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া যা প্রকৃতি ও মৌসুমের সাথে তাল মিলিয়ে চলে। প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পরবর্তী বছরের জন্য জায়গা নির্বাচন করা হয় এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে জঙ্গল কাটা হয়। এরপর মার্চ-এপ্রিল মাসে ফায়ারিং লাইন তৈরি করে জঙ্গল পোড়ানো হয় এবং পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে জায়গা পরিষ্কার করে বীজ বপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
বৈশাখের শুরুতে বৃষ্টি হলে ধান ও সাথি ফসলের বীজ বপন করা হয়।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রতিবছর জুম চাষের পরিমাণ বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয়ে ১০ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়ে ১২ হাজার ৪৯৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এবং একই পরিমাণ জমিতে আবাদ হয়েছে। এই বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন চাল নির্ধারণ করা হয়েছে।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর জানিয়েছেন, চলতি বছর প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয়েছে। তিনি জানান, এ বছর ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে, তবে সব জায়গায় বৃষ্টিপাত সমান না হওয়ায় ফলন ভিন্ন হতে পারে। তিনি আরও জানান, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকায় ইতোমধ্যে ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উপজেলাতেও এই কাজ শুরু হবে।
