সন্তানদের বড় করে তোলার ক্ষেত্রে মা-বাবার ত্যাগ অপরিসীম। একজন মা যখন সন্তানের জন্ম দেন, তখন তিনি ভবিষ্যতের কোনো প্রতিদান আশা করেন না। একইভাবে, একজন বাবা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেন এবং তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের অনেক শখ বিসর্জন দেন। মা-বাবার এই ভালোবাসা নিঃস্বার্থ এবং এর কোনো পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
তারা দশজন সন্তানকে একই ছাদের নিচে বড় করে তোলেন, সবার সুখ-দুঃখ সমানভাবে ভাগ করে নেন এবং নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের স্বপ্ন পূরণে কাজ করেন। নিজের নতুন পোশাক না কিনে সন্তানের জন্য কেনা বা নিজের ক্ষুধার কথা ভুলে সন্তানের পেট ভরানোর মতো ঘটনা মা-বাবার ত্যাগেরই বহিঃপ্রকাশ।
তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে অনেক মা-বাবাকে এক কঠিন ও বেদনাদায়ক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। যে সন্তানদের জন্য তারা সারাজীবন লড়াই করেছেন, সেই সন্তানদের কেউ কেউ বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবাকে বোঝা মনে করতে শুরু করেন। তখন মা-বাবাকে নিয়ে শুরু হয় দায়িত্ব ভাগাভাগির হিসাব। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মা এক সন্তানের কাছে এবং বাবা অন্য সন্তানের কাছে থাকছেন।
কয়েক মাস পরপর তাদের স্থান পরিবর্তন করতে হয়। এই পরিস্থিতি মা-বাবাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তারা যেন মানুষ নন, বরং ভাগ করে নেওয়ার মতো কোনো সম্পদ বা বস্তু। এই প্রবণতা আধুনিক সমাজের জন্য একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষা বা বড় পদে চাকরি করার পরও অনেক সন্তান বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করেন।
অথচ অনেক সাধারণ মানুষ সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মা-বাবার সেবা করে যাচ্ছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃত শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানুষের বিবেক, আচরণ এবং মানবিকতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মা-বাবা কখনো সন্তানদের মধ্যে বিভাজন করেন না, তারা সব সন্তানকেই সমান ভালোবাসেন। তাহলে সন্তানরা কেন মা-বাবাকে ভাগ করে নেয়?
কেন জীবনের শেষ সময়ে এসে একজন মাকে তার স্বামীর কাছ থেকে এবং একজন বাবাকে তার জীবনসঙ্গিনীর কাছ থেকে আলাদা থাকতে হয়? বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সন্তানের ভালোবাসা, সম্মান এবং পাশে থাকার আশ্বাস। তারা কোনো বিলাসিতা, বড় বাড়ি বা দামি উপহার চান না। তারা শুধু চান সন্তানদের আন্তরিকতা এবং কিছু সময়।
মনে রাখা প্রয়োজন যে, সময়ের চাকা কারো জন্য থেমে থাকে না। আজ যারা মা-বাবার সঙ্গে অবহেলামূলক আচরণ করছেন, একদিন তারাও বৃদ্ধ হবেন। বর্তমান প্রজন্ম তাদের মা-বাবার সঙ্গে যেমন আচরণ করছে, আগামী প্রজন্ম ঠিক সেই শিক্ষাই গ্রহণ করবে। তাই শুধু ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মানুষ না হয়ে প্রকৃত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করা জরুরি।
মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধকে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই একজন মায়ের ভালোবাসা বা একজন বাবার ত্যাগের সমান শিক্ষা দিতে পারে না। তাই মা-বাবাকে ভাগ করে নেওয়ার পরিবর্তে তাদের সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে একসঙ্গে রাখাই হোক মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
