বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে একতরফা শ্রেণিযুদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় শ্রমিক শক্তির সদস্য সচিব ঋআজ মোর্শেদ। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতির মাধ্যমে তিনি এই বিষয়ে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, যানজট নিরসনের নামে রিকশাচালকদের ওপর জুলুম চালানো হচ্ছে, অথচ যানজট সৃষ্টির প্রকৃত কারণগুলোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না।
ঋআজ মোর্শেদ তার বক্তব্যে প্রশ্ন তোলেন যে, শহরের যানজটের জন্য আসলে কারা দায়ী। তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত গাড়িতে একা ভ্রমণকারী অভিজাত শ্রেণি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের মধ্যে তুলনা করেন। তার মতে, যত ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা লাঠিপেটা করা হচ্ছে, তার সবটাই এসে পড়ছে খেটে খাওয়া এই রিকশাচালকদের ওপর।
তিনি একে ট্রাফিক শৃঙ্খলার বিষয় না বলে সরাসরি শ্রেণিযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার অভিযোগ, লুটেরা আমলাতন্ত্র এবং শোষক গোষ্ঠী একত্রিত হয়েছে যাতে সাধারণ যাত্রী ও রিকশাচালকরা আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি মনে করেন, রাজপথগুলোকে কেবল বিত্তবানদের দামি গাড়ির চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখার উদ্দেশ্যেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রযুক্তিকে তিনি একটি ইতিবাচক উদ্ভাবন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্যমতে, এই প্রযুক্তি মানুষকে অমানুষিক প্যাডেল রিকশা চালানোর কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়েছে। এটি হাজার হাজার চালকের শারীরিক পরিশ্রম কমিয়েছে এবং ছাত্র, শিক্ষক ও চাকরিজীবীসহ কোটি মানুষের যাতায়াতের সময় ও অর্থ সাশ্রয় করেছে। এই প্রযুক্তি ধ্বংস করার অর্থ হলো জাতিকে পুনরায় মধ্যযুগীয় যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেওয়া।
পরিবেশের দোহাই দিয়ে রিকশাচালকদের জীবিকা বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যদি পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হয়, তবে নিম্নমানের ও বিষাক্ত ব্যাটারি আমদানিকারক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বিদেশ থেকে নিম্নমানের ব্যাটারি আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। পাশাপাশি দেশে মানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদন এবং পুনর্ব্যবহারের কারখানা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
আসল অপরাধী সিন্ডিকেটকে গ্রেপ্তার না করে রিকশাচালকদের রিকশা ভেঙে ফেলাকে তিনি অবিচার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, রাস্তা কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা আমলার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের। রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, রিকশাচালক ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে তাদের জরিমানার আওতায় আনা যেতে পারে।
তবে একই আইন বেপরোয়া বাস এবং ক্ষমতাশালীদের ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তিনি আগামী দুই বছরের মধ্যে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানান, যার মাধ্যমে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে উন্নীত করা হবে যাতে মানুষ নিজেই রিকশার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনে। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, ঢাকার অলিগলিতে রিকশার কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
কোনো বিকল্প ব্যবস্থা বা মহাপরিকল্পনা ছাড়া গায়ের জোরে কোটি মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম বন্ধ করার উদ্যোগকে তিনি মূর্খতা ও অন্ধ দম্ভ বলে অভিহিত করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যাত্রী ও চালকদের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। গরিব মানুষের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটিতে আঘাত না করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
