ফেনী শহর যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার পর থেকে দীর্ঘ ১২ বছর অতিবাহিত হলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ২০১৪ সালের ২০ মার্চ রাত ৩টার দিকে ফেনী শহরের পাঠানবাড়ি রোডের একটি ভাড়া বাসা থেকে সশস্ত্র একদল লোক র্যাব পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়।
ঘটনার পরদিন সকালে রিপনের মা রৌশন আরা বেগম ফেনীর র্যাব-৭ এর অস্থায়ী কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় যে, রিপন নামের কাউকে তারা আটক করেনি। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। এই ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করা হয়েছিল।
রিপনের মা রৌশন আরা বেগম অভিযোগ করেন যে, তার ছেলে গুম হওয়ার পেছনে তৎকালীন স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ইন্ধন ছিল। তিনি জানান, ঘটনার পর পুলিশ প্রথমে মামলা নিতে চায়নি এবং পরবর্তীতে মামলা নিলেও তদন্ত আর এগোতে দেওয়া হয়নি। ১২ বছর ধরে বিচারের আশায় তিনি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন।
রিপন নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। রিপনের স্ত্রী দুই মেয়ে ফারিয়া ও নিশাতকে রেখে চলে যান এবং পরবর্তীতে অন্যত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে বয়সের ভার, শারীরিক অসুস্থতা ও তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন রৌশন আরা বেগম। তার অন্য এক ছেলেও গুরুতর অসুস্থ এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জোরালো হলেও রৌশন আরার অপেক্ষার অবসান ঘটেনি। তিনি ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, যাদের জন্য তার ছেলে রাজনীতি করত, সেই দলের নেতারাও এখন আর তাদের কোনো খোঁজ নেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি বিচার ও সত্যের সন্ধান চেয়ে আকুতি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, তার ছেলে কোথায় আছে তা তিনি জানতে চান। যদি রিপন বেঁচে থাকে তবে তাকে পরিবারের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। আর যদি কোনো অঘটন ঘটে থাকে, তবে অন্তত সেই সত্যটি যেন তাকে জানানো হয়। রিপনের মতো আর কেউ যেন এভাবে গুমের শিকার না হয়, বর্তমান সরকার যেন সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করে, এমনটাই প্রত্যাশা তার।
রিপনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। দীর্ঘ এক যুগ ধরে প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা এই পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন অতিবাহিত করছে। রিপনের দুই সন্তান ফারিয়া ও নিশাতও তাদের বাবার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছে। পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার প্রশাসনের কাছে ধরনা দেওয়া হলেও কোনো সুরাহা মেলেনি।
এই দীর্ঘ সময়ে রিপনের মা রৌশন আরা বেগম শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি এখন কেবল তার ছেলের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। রিপনের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি ফেনীর স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও এর কোনো আইনি সুরাহা আজ পর্যন্ত হয়নি। পরিবারের সদস্যরা এখনো আশা করে আছেন যে, হয়তো কোনো একদিন রিপন ফিরে আসবে অথবা তার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য উন্মোচিত হবে।
