দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির বিষয়টি দীর্ঘ ১৩ বছরের আইনি জটিলতা কাটিয়ে উঠলেও বর্তমানে প্রশাসনিক স্থবিরতার মুখে পড়েছে। গত ২ জুন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি সংক্রান্ত আইনি বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেন। এই রায়ের মাধ্যমে হাজার হাজার সহকারী শিক্ষকের প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হওয়ার আইনি পথ সুগম হয়।
তবে রায় ঘোষণার তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও আদালতের রায়ের মূল কপি বা সার্টিফাইড কপি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের হাতে না পৌঁছানোয় পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, আদালতের রায়ের অনুলিপি ছাড়া কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ বা প্রজ্ঞাপন জারি করার সুযোগ নেই।
ফলে ৩৬ হাজার ২৩৫টি শূন্য পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া বর্তমানে পুরোপুরি থমকে আছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী জানিয়েছেন, আদালতের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অধিদপ্তর বদ্ধপরিকর। রায়ের কপির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানানো হয়েছে এবং তা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে অধিদপ্তর। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রায়ের কপি হাতে পাওয়া মাত্রই আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে দেশে মোট ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করলেও তারা পদমর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আদালতের রায়ের পর শিক্ষকদের মধ্যে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, রায়ের কপি পেতে বিলম্ব হওয়ায় তা এখন উদ্বেগে রূপ নিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পদোন্নতি প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় মাঠপর্যায়ে শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা বা গ্রেডেশন তৈরিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ সময়ে অনেক শিক্ষকের চাকরির তথ্যে পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষকদের চাকরিবহির তথ্য যাচাই, পদোন্নতির যোগ্যতা নির্ধারণ এবং জ্যেষ্ঠতার সঠিক ক্রম সাজানো এখন অধিদপ্তরের জন্য একটি জটিল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো যোগ্য শিক্ষক যাতে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত না হন, সেজন্য অধিদপ্তর নির্ভুল তালিকা প্রণয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তবে তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন হলেও আদালতের মূল রায়ের কপি ছাড়া সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা আইনত সম্ভব নয়। ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ ১৩ বছরের আইনি লড়াই ও আন্দোলনের পর তারা দ্রুত পদোন্নতি প্রত্যাশা করছেন। আদালতের রায় ঘোষণার পর তিন মাস ধরে কপির জন্য অপেক্ষা করা তাদের জন্য হতাশাজনক।
তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুততম সময়ে রায়ের কপি সংগ্রহ করে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানিয়েছেন। এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক শিক্ষা খাতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি হবে। ৩৬ হাজার ২৩৫ জন সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেলে তাদের বর্তমান পদগুলো খালি হয়ে যাবে।
এতে বিদ্যমান শূন্য পদ ও পদোন্নতিজনিত নতুন পদ মিলে মোট ৩৮ হাজার ৪৩৩টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিশাল শূন্যতা পূরণের জন্য পরবর্তীতে নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চ্যালেঞ্জও অধিদপ্তরের সামনে আসবে। তবে বর্তমানে সব মনোযোগ আদালতের রায়ের কপির ওপর নিবদ্ধ। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার ওপরই নির্ভর করছে প্রাথমিক শিক্ষা খাতের এই বড় পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ।
প্রশাসনিক এই দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুত পদোন্নতি সম্পন্ন করা এখন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
