ডায়াবেটিস বর্তমানে একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা অনিয়মিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা দেখা দেয়। তবে নারী ও পুরুষের শরীরে ডায়াবেটিসের প্রভাব সবসময় একইভাবে কাজ করে না।
হরমোন, শারীরিক গঠন, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং হৃদরোগের ঝুঁকির পার্থক্যের কারণে দুই লিঙ্গের ক্ষেত্রে এই রোগের প্রভাব ও জটিলতায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের প্রভাব কতটা আলাদা, তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। হরমোনের মাত্রা এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ার পার্থক্যের কারণে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ, বিষণ্ণতা এবং রোগ-সংক্রান্ত মানসিক চাপের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, পুরুষদের ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্র, কিডনি এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা কম বয়সেই দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষদের হৃদযন্ত্র ও কিডনির স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি নজরদারি রাখা অত্যন্ত জরুরি। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিক মাত্রা এবং অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যা হৃদরোগ ও কিডনির জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এ কারণে পুরুষদের নিয়মিত রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা, কিডনির কার্যকারিতা যাচাই এবং প্রস্রাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। নারীদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী রোগের সঙ্গে বসবাসের ফলে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আবার মানসিক অস্বস্তি ও অতিরিক্ত চাপ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো পালন করা কঠিন করে তোলে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও রোগ-সংক্রান্ত মানসিক চাপের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তাই নারীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, পরিবারের সহায়তা এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
হরমোনের পরিবর্তনও ডায়াবেটিসের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। নারীদের বয়ঃসন্ধি, মাসিক, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজের মতো বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তন রক্তে গ্লুকোজের বিপাক এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সকে সরাসরি প্রভাবিত করে। পুরুষদের ক্ষেত্রেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমোন ও বিপাকীয় পরিবর্তন শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অর্থ কেবল রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখা নয়। এর পাশাপাশি হৃদযন্ত্র ও কিডনির স্বাস্থ্য, শরীরের ওজন, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, মানসিক সুস্থতা, হরমোন ও প্রজননস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীবনযাপন পদ্ধতি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নিয়মিত গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, কিডনির কার্যকারিতা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি, চোখ ও পায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ দৃষ্টির পরিবর্তন, শরীরের কোনো অংশ অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, পায়ে গুরুতর ক্ষত বা প্রস্রাবের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও নজরদারি ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তাই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং নিজের শারীরিক পরিবর্তনগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করাই সুস্থ থাকার প্রধান উপায়।
নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ডায়াবেটিসজনিত ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
