বাংলাদেশের পরিব্রাজক নাজমুন নাহার গত ৭ আগস্ট ভুটান সফরের মাধ্যমে বিশ্বের ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তার এই দীর্ঘ ভ্রমণ অভিযানের বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে প্রথম বাংলাদেশি এবং বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের কৃতিত্ব অর্জনকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অর্জন বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই ধরনের দাবির ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা এবং যাচাইযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ‘বিশ্বের প্রথম’, ‘প্রথম নারী’ বা ‘একমাত্র’—এ ধরনের সুপারলেটিভ বা তুলনামূলক শব্দ ব্যবহারের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কারণ এই ধরনের দাবিগুলো সাধারণ তথ্যের চেয়ে ভিন্ন এবং এগুলো প্রমাণের দাবি রাখে।
একটি দাবিকে ‘বিশ্বের প্রথম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সেই ক্যাটাগরির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা, সময়সীমা এবং এর আগে একই ধরনের অর্জন অন্য কেউ করেছেন কি না, তা যাচাই করা আবশ্যক। নাজমুন নাহারের ক্ষেত্রে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের তথ্যটি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হলেও ‘বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী’ হিসেবে তার এই অর্জনের পেছনে কোনো স্বাধীন বা সর্বজনস্বীকৃত আন্তর্জাতিক রেকর্ড বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
ভ্রমণকারীদের অর্জনের সংজ্ঞা ও ক্যাটাগরি ভিন্ন হতে পারে। কেউ নির্দিষ্ট সংখ্যক দেশ ভ্রমণের রেকর্ড করতে পারেন, আবার কেউ বিশ্বের সব স্বীকৃত দেশ ভ্রমণের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন। এছাড়া জাতীয়তা, পরিবহনপদ্ধতি বা অন্য কোনো বিশেষ ক্যাটাগরির ভিত্তিতেও রেকর্ডের ভিন্নতা থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের একটি তথ্য অনুযায়ী, তানসেল বুয়ুকবাইক নামের একজন পর্যটক ১৯৫টি দেশ ভ্রমণ করে বিশ্বের সব দেশ ভ্রমণের লক্ষ্য পূরণকারী প্রথম তুর্কি নারী হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন।
এই ধরনের ভিন্ন ভিন্ন রেকর্ডের মধ্যে সরাসরি তুলনা করা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি রেকর্ডের ক্যাটাগরি ও সংজ্ঞা আলাদা। তাই কোনো দাবিকে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে উপস্থাপনের আগে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। যদি কোনো দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হয়, তবে সেটিকে সরাসরি তথ্য হিসেবে না লিখে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা অধিকতর নিরাপদ।
এক্ষেত্রে ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে নাজমুন নাহারকে বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে’—এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ধরনের উপস্থাপনা পাঠককে স্পষ্ট করে দেয় যে এটি একটি দাবি, যা এখনো সর্বজনস্বীকৃত কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক যাচাইকৃত নয়। সাংবাদিকতার নীতি অনুযায়ী, কোনো তথ্য যত বেশি চমকপ্রদ হয়, সেটি যাচাই করার দায়িত্বও তত বেশি বৃদ্ধি পায়। ‘প্রথম’ বা ‘একমাত্র’ জাতীয় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রমাণ থাকা আবশ্যক।
স্বাধীনভাবে প্রমাণ পাওয়া না গেলে স্বীকৃতি বা দাবির উৎস উল্লেখ করা শ্রেয়। একটি সংবাদের নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্যের স্বচ্ছতা এবং যাচাইযোগ্যতার ওপর। পাঠক যাতে বুঝতে পারেন কোনটি নিশ্চিত তথ্য এবং কোনটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সূত্রের দাবি, তা নিশ্চিত করাই সংবাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। নাজমুন নাহারের ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের অর্জনটি নিঃসন্দেহে একটি বড় মাইলফলক, তবে এর সাথে যুক্ত ‘বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী’ হওয়ার দাবিটি এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো রেকর্ডের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়।
তাই এই ধরনের তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা এবং দাবির উৎস উল্লেখ করা সাংবাদিকতার মানদণ্ড অনুযায়ী যথাযথ।
