দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠনের সাম্প্রতিক প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ, দলীয় স্বার্থপ্রসূত এবং অগ্রহণযোগ্য বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বুধবার রাতে দলটির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন এক যৌথ বিবৃতিতে এই অভিযোগ উত্থাপন করেন। তারা জানান, দীর্ঘ সাত মাস কমিশনকে কমিশনারবিহীন ও কার্যত অকার্যকর রাখার পর যে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে, তা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, আপিল বিভাগের একজন সাবেক বিচারপতিকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। নেতারা দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত দুদক অধ্যাদেশ বাতিল করে কমিশনকে আবারও ফ্যাসিবাদী আমলের মতো সরকারি দলের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।
এটি জুলাই সনদে বর্ণিত জবাবদিহির নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তারা মন্তব্য করেন। এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, গত সাত মাসে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে সরকারি প্রভাব খাটিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠলেও দুদক নীরব রয়েছে। তাদের মতে, দুর্নীতির প্রতি কমিশনের এই নীরবতা প্রমাণ করে যে এটি শুরু থেকেই বিতর্কিত এবং এর কোনো নৈতিক বা আইনি বৈধতা নেই।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যখনই বিরোধী দলগুলো জনগণের অধিকার আদায়ের দাবিতে রাজপথে নামছে, তখনই নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে দুদককে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পুরোনো অপকৌশল শুরু হয়েছে। এটি পরাজিত ফ্যাসিবাদের আমলের নিপীড়নমূলক কায়দার পুনরাবৃত্তি মাত্র। অতীতেও এই কমিশনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল বলে তারা উল্লেখ করেন।
বর্তমান কমিশনকে ব্যবহার করে বিরোধী দল দমনের একটি ‘ড্রেস রিহার্সেল’ চলছে বলেও তারা দাবি করেন। বিবৃতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা এবং এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। নেতারা জানান, অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদকের মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক তদন্তে ‘দুর্নীতির সত্যতা’ পাওয়ার দাবি করেন।
কিন্তু পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা পাঠিয়ে ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ জানান। সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে অসত্য তথ্য দেওয়ার পর গোপনে তা সংশোধনের এই অপচেষ্টার মাধ্যমে দুদক তার ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা হারিয়েছে বলে তারা মনে করেন। এনসিপি নেতাদের মতে, যে কমিশন তদন্ত শুরুর আগেই বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়, তাদের অধীনে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অসম্ভব।
তারা বর্তমান অসংবিধানিক কমিশন বাতিল করে জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানান। অন্যথায়, এসব অনুসন্ধানকে তারা বিরোধী দল দমনের নতুন চক্রান্ত হিসেবে অভিহিত করেন। বিবৃতিতে সরকারকে এই ফ্যাসিবাদী পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। এনসিপি নেতারা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অসংবিধানিক ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় গঠিত এই নিয়োগ অনতিবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। দুদককে ‘বিরোধী দল দমন কমিশন’-এ পরিণত করার অপচেষ্টা বন্ধ করে সরকারের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। নেতারা চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দুদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ইনস্টিটিউশনকে সরকারি দলের অবৈধ কর্মকাণ্ডের রক্ষাকবচ বানানোর চক্রান্ত জনগণ মেনে নেবে না।
অনতিবিলম্বে এই অসংবিধানিক নিয়োগ বাতিল করে স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা না হলে এনসিপি দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলবে বলে তারা ঘোষণা দেন।
