প্রজনন মৌসুমের কারণে তিন মাস বন্ধ থাকার পর সুন্দরবনে প্রবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে বন বিভাগের নিয়ম মেনে জেলে ও পর্যটকদের জন্য বনের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে প্রথম দিনেই জেলেদের মধ্যে বনে প্রবেশের আগ্রহ তুলনামূলক কম দেখা গেছে। টানা বৃষ্টি, নদীতে মরা জোয়ার এবং দস্যুতার ভয়ের কারণে অনেক জেলে বনের গভীরে যেতে দ্বিধা বোধ করছেন।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশনের অধীনে ৯৫৪টি নৌযানের নিবন্ধন থাকলেও বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত মাত্র একজন জেলে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করেছেন। একই চিত্র দেখা গেছে কৈখালী ও কদমতলা ফরেস্ট স্টেশনেও। এই দুটি স্টেশনের আওতায় ১ হাজার ২৬টি নিবন্ধিত নৌযান থাকলেও বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত মাত্র ৩৭ জন জেলে বনে প্রবেশের অনুমতি নিয়েছেন।
জেলেরা জানিয়েছেন, তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সময়ও কিছু অসাধু ব্যক্তি বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করেছে, যার ফলে বনের মৎস্য ও কাঁকড়ার সম্পদ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দস্যুদের চাঁদা দাবির ভয়ও জেলেদের মধ্যে কাজ করছে। অনেক জেলে জানিয়েছেন, মাছের পর্যাপ্ত জোগান না পাওয়ার আশঙ্কায় এবং নিরাপত্তার অভাবে তারা বনের গভীরে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
তবে জেলেদের অনাগ্রহ থাকলেও পর্যটকদের মধ্যে উৎসাহ দেখা গেছে। সুন্দরবন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, প্রথম দিনেই খুলনা থেকে সাতটি লঞ্চে প্রায় ২২০ জন পর্যটক সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। স্থানীয় নৌকার মাঝিরাও পর্যটকদের নিয়ে বনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে কলাগাছিয়া ও দুবেকী পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
এছাড়া মোংলার করমজল ও হারবাড়িয়াও পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে সংরক্ষিত, যেখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত। পর্যটকদের শুধুমাত্র নির্ধারিত পথ ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে পর্যটকদের পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্লাস্টিকের বোতল বা খাবারের প্যাকেট বনের ভেতর না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান জানিয়েছেন, পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে পন্টুন মেরামত এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। জেলে ও পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বন বিভাগের ক্যাম্প ও স্টেশনগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটক ও বননির্ভর মানুষদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের চারটি রেঞ্জে এবার মোট ১২ হাজার নৌযানকে মাছ ধরার অনুমতি বা বিএলসি দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ তিন মাস পর বন খুলে দেওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরার আশা করা হচ্ছে, তবে জেলেদের নিরাপত্তা ও মৎস্য সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, সংসার চালানোর তাগিদে তারা এখন মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তবে বনের ভেতরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তারা গভীর অরণ্যে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছেন। বন বিভাগ আশা করছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেলেদের উপস্থিতি বাড়বে এবং পর্যটন মৌসুমের শুরুটা সুন্দরবনের জন্য ইতিবাচক হবে।
