জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনটি বিল পাসের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করেছেন। রোববার ৬ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে চলা অধিবেশনে এই ঘটনা ঘটে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর বিল পাসের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
সংসদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তারা মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে সংসদ ভবনের টানেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলের নেতারা এই দিনটিকে সংসদের জন্য একটি কালো দিন হিসেবে অভিহিত করেন। সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তোলেন।
তিনি দাবি করেন, বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে কথা বলার সুযোগ চাইলেও স্পিকার তাকে সেই সুযোগ দেননি, বরং তার সঙ্গে মশকরা করেছেন। চিফ হুইপ আরও অভিযোগ করেন যে, সরকার বিরোধীদলের মতামতের তোয়াক্কা না করেই তড়িঘড়ি করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পাস করেছে।
তার মতে, এই বিলগুলোতে স্বাধীন তদন্তের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় মুখপাত্র নজিবুর রহমান সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর বিলটিকে কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী বলে দাবি করেছেন। তিনি আইনমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, ইসলামের ধারণা না রেখেই তিনি সংসদে বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন।
নজিবুর রহমানের মতে, স্পিকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, কিন্তু তিনি তা পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ বিলকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেগুলোকে দুর্বল করে পাস করেছে। এই আইনগুলোকে কালো আইন হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে জনগণের মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে গুম ও খুনের নতুন সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
বিরোধীদলের নেতারা দাবি করেন, সরকার ১৭ বছরের নির্যাতনের ইতিহাস ভুলে গিয়ে আবারও পুরোনো নিয়মেই দেশ পরিচালনা করছে। তারা মনে করেন, এই বিলগুলো জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী এবং এর মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে বিলগুলো পাসের প্রক্রিয়ায় বিরোধীদলের অংশগ্রহণ না থাকায় এবং তাদের দাবিগুলো আমলে না নেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বিরোধীদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এই বিলগুলোর বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সংসদীয় কার্যপ্রণালীতে বিরোধীদলের এই ওয়াকআউট এবং পরবর্তী প্রতিবাদ কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদলের এই কঠোর অবস্থান এবং বিলগুলোর বিষয়বস্তু নিয়ে তাদের আপত্তি সংসদীয় বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অধিবেশন চলাকালীন এই ঘটনাটি সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় বিরোধীদলের ভূমিকা এবং সরকারের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিরোধীদলের নেতারা তাদের সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সংসদে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবেন এবং সরকারের যেকোনো জনবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবেন।
