ঢাকা শহরের কবরস্থানগুলোর ব্যবস্থাপনা সহজতর করতে এবং দাফন সংক্রান্ত তথ্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আনতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ডিজিটাল প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘গ্রেভইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট ডিএনসিসি’ এবং ‘গ্রেভইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট ডিএসসিসি’ নামে দুটি পৃথক অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কবরস্থান সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য একীভূত করার কাজ চলছে।
বর্তমানে অধিকাংশ নাগরিকের জন্য স্বজনের কবরের অবস্থান শনাক্ত করা বা দাফন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। এই ভোগান্তি দূর করতেই সিটি করপোরেশনগুলো ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির এই কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের আওতাধীন কবরস্থানগুলোর কবরের তথ্য নিয়ে একটি শক্তিশালী ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৩ মে নগর ভবনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, কবরস্থানের প্রতিষ্ঠাকাল, আয়তন, মোট কবরের সংখ্যা এবং দাফন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য এই ডেটাবেজে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রথম ধাপে বনানী, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী, রায়েরবাজার এবং উত্তরা ৪, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানগুলোকে এই ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে দাফনের আবেদন প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। নাগরিকেরা ঘরে বসেই মৃত ব্যক্তির প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র আপলোড করে দাফনের আবেদন করতে পারছেন। আবেদন অনুমোদনের পর দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং পরবর্তীতে অনলাইনে সনদ পাওয়ার সুযোগও রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আজিমপুর কবরস্থানেও ডিজিটালাইজেশনের কাজ চলমান রয়েছে।
কবরস্থানের মোহরার হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, আজিমপুর কবরস্থানে লেন নম্বর চালু করা হয়েছে এবং খুব দ্রুত প্রতিটি কবরের নম্বর যুক্ত করার কার্যক্রম শুরু হবে। এই ব্যবস্থা চালু হলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কবরের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হবে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জানিয়েছেন, আজিমপুর কবরস্থানে প্রায় ২৬ হাজার কবর রয়েছে, যার কোনো সুনির্দিষ্ট নম্বর না থাকায় স্বজনদের কবর খুঁজে পেতে সমস্যা হয়।
তিনি জানান, কবরস্থানের তথ্য হালনাগাদ করার পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং অ্যাপের মাধ্যমে ফাঁকা কবরের তথ্য জানানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির এই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গুগল প্লে স্টোরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অ্যাপটির ডাউনলোড সংখ্যা এক হাজারের সামান্য বেশি, যা বিশাল জনসংখ্যার এই শহরের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
ব্যবহারকারীদের একাংশ সেবা পেতে বিলম্বের অভিযোগও করেছেন। এছাড়া, ডিজিটাল ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদের ওপর। প্রতিদিন নতুন দাফন, কবরের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং কবর পুনর্ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে ডেটাবেজে যুক্ত না করলে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-১ শাখার যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, নতুন কবরস্থান নির্মাণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল।
সিটি করপোরেশন সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা দিলে সরকার প্রশাসনিক অনুমোদন প্রদান করবে। আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার মাওলানা হাফিজুর রহমান নতুন কবরস্থানের জন্য জমি খোঁজার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, কারণ বিদ্যমান কবরস্থানগুলোতে জায়গার সংকুলান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ডিজিটাল সেবা পূর্ণাঙ্গ করতে হলে কেবল অ্যাপ তৈরিই যথেষ্ট নয়, বরং দাফন ও সংরক্ষণ ফি অনলাইনে জমা দেওয়া এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাথে এর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সমাজ কল্যাণ কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, তাদের অ্যাপটি ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল থেকে সার্টিফিকেশন পাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই সনদ পাওয়া গেলে নাগরিকেরা আরও সহজে অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারবেন। সব মিলিয়ে, ডিজিটাল কবরস্থান ব্যবস্থাপনা কেবল একটি অ্যাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, একে একটি সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদকৃত ব্যবস্থার আওতায় আনাই এখন কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।
